জাতীয়তাবাদ ও সংস্কার আন্দোলন
1. শুদ্ধি আন্দোলন বলতে কী বোঝো ?
উত্তর : ব্যাপক ধর্মান্তরের ফলে হিন্দু সমাজে ভাঙ্গন দেখা দেয়। হিন্দু সমাজকে এই ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার জন্য আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী অহিন্দু ও ধর্মান্তরিত হিন্দুদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য যে কর্মসূচি গ্রহণ করেন তা শুদ্ধি আন্দোলন নামে পরিচিত।
2. ডিরোজিও স্মরণীয় কেন ?
উত্তর : নব্য বঙ্গ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনি উনিশ শতকের কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কাকে ভারতের প্রথম জাতীয়তাবাদী কবি বলা হয়।
3. আর্য সমাজ আন্দোলনর প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল ?
উত্তর: আর্য সমাজ আন্দোলনর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বেদভিত্তিক সমাজ গঠন ও হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া, অহিন্দু ও ধর্মান্তরিত হিন্দুদের হিন্দু ধর্মে ফিরে আনাও আর্য সমাজের অপর উদ্দেশ্য ছিল।
4. পথের দাবী ও নীলদর্পণ কে রচনা করেন ?
উত্তর : পথের দাবী রচনা করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নীলদর্পণ রচনা করেন দীনবন্ধু মিত্র।
5. ইলবার্ট কে ছিলেন ? ইলবার্ট বিলের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল ?
উত্তর : ইলবার্ট ছিলেন লর্ড রিপনের আইন সচিব।
ইলবার্ট বিলের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ যাতে ইউরোপীয় বিচারকের মর্যাদা লাভ করে ইউরোপীয় অপরাধীর বিচার করতে পারে তার আইনগত ব্যবস্থা করা, অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বিচারপতিদের মধ্যে আইনগত বৈষম্য দূর করা।
6. টীকা লেখ : মেকলের প্রতিবেদন।
উত্তর : মেকলের প্রতিবেদন বা মেকলে মিনিটস
পাশ্চাত্য সমর্থকদের মতে লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারতের গভর্নর-জেনারেল নিযুক্ত হলে (১৮২৮-৩৫ খ্রি.) এদেশে পাশ্চাত্য-শিক্ষা প্রসারের পথ প্রশস্ত হয়। টমাস ব্যাবিংটন মেকলে-কে 'পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটির সভাপতি নিয়োগ করেন বেন্টিঙ্ক। মেকলে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রসারের সপক্ষে বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন (১৮৩৫ খ্রি.)। এই প্রতিবেদন ‘মেকলে মিনিটস্’ (Macaulay Minutes) নামে খ্যাত।
বিভিন্ন প্রস্তাব: মেকলে মিনিটসের বিভিন্ন প্রস্তাবে বলা হয় চৈত. প্রাচ্যের সভ্যতা দুর্নীতিগ্রস্ত, অনুন্নত ও নির্বুদ্ধিতাসম্পন্ন, (II) প্রাচ্য-শিক্ষা নিকৃষ্ট ও বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন, (iii) প্রাচ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটতে পারে একমাত্র পাশ্চাত্য-শিক্ষার হাত ধরেই। মেকলে বলেন, ভারতীয়দের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য-শিক্ষা দিলে, তাদের মাধ্যমে আরও বহু ভারতীয় পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ সীমিত সংখ্যক পাশ্চাত্য-শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্য দিয়ে পরিত হয়ে ইংরেজি শিক্ষা জনগণের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে যাবে—এই নীতি ইনফিলট্রেশন থিয়োরি (Infiltration theory) নামে পরিচিত। মেকলে দম্ভভরে বলেছিলেন, এক আলমারি পাশ্চাত্য পুস্তক থেকে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, প্রাচ্যের সমস্ত গ্রন্থাগার ঘাঁটলেও তা পাওয়া যাবে না।
মন্তব্য: মেকলের প্রতিবেদনের ফলেই ভারতে ইংরেজি শিক্ষার দ্বার খুলে যায়। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ মার্চ এই প্রস্তাব সরকারের অনুমোদন পায়।
7. প্রার্থনা সমাজের আদর্শ ও লক্ষ্য কী ছিল ?
উত্তর : প্রার্থনা সমাজের আদর্শ ও লক্ষ্য :
ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ড. আত্মারাম পাণ্ডুরা মহারাষ্ট্রে প্রার্থনাসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর প্রার্থনাসমাজে যোগ দেন ও একে একটি শক্তিশালী সমাজসংস্কারক প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তোলেন।
>> আদর্শ: প্রার্থনাসমাজের সদস্যরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন। তবে ব্রাহ্মসমাজের মতো এঁরা কোনো নতুন ধর্মমতের কথা প্রচার করেননি। এঁরা বেদকে অভ্রান্ত বা অপরিবর্তনীয় বলে মনে করতেন না। পাশ্চাত্য আদর্শ ও ভাবধারায় প্রভাবিত হলেও এই সংগঠনটি সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি ও রীতিনীতি মেনে কাজ করায় বিশ্বাসী ছিল। প্রার্থনা সমাজ সমগ্র মানবজাতির ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের স্বপক্ষে এবং জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতার নীতিতে আস্থাশীল ছিল।
>> লক্ষ্য: হিন্দুধর্ম ও সমাজের মধ্যে থেকে ধর্ম ও সমাজের সংস্কার করাই ছিল এঁনের লক্ষ্য।
(1) প্রার্থনাসমাজের সদস্যরা জন্মান্তরবাদ ও পৌত্তলিকতাবাদের অবসানসহ বিভিন্ন কুসংস্কারের। বিলুপ্তির মাধ্যমে হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।
(2) জাতিভেদ প্রথার অবসান এবং পুরোহিতদের প্রাধান্য খর্ব করা ছিল এই সমাজের লক্ষ্য।
(3) বিধবাবিবাহ প্রচলন, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, পর্দাপ্রথার অবসান, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা ইত্যাদি ছিল প্রার্থনাসমাজের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
8. স্বামী বিবেকানন্দ যুব শক্তিকে কিভাবে উদ্দীপিত করেন ?
উত্তর : স্বামী বিবেকানন্দ ও যুব শক্তি :
স্বামী বিবেকানন্দের নানা প্রবন্ধ ও বক্তৃতা তরুণ দেশপ্রেমিকদের মধ্যে উদ্দীপনার সম্ভার করে। অধঃপতিত ভারতবাসীকে তিনি আবুবলে বলীয়ান হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। স্বামীজী পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে বলেছিলেন।
(1) হতাশাগ্রস্ত যুবসমাজকে তিনি দেশের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের যুবশক্তি জাগ্রত না-হলে দেশ ও সমাজের মঙ্গলসাধন সম্ভব নয়। তাই তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ডাক দেন, “ওঠো, জাগো লক্ষ্যে পৌঁছোবার আগে থেমো না।”
(2) স্বামীজী সকলকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দৃঢ়তা, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর মনোবল রপ্ত করার পরামর্শ দেন।
(3) জাতিভেদ, ধর্মীয় কুসংস্কার, সামাজিক অনাচার, অশিক্ষা, অসাম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য তিনি তরুণ সমাজকে উদ্দীপিত করেন।
(4) স্বামীজি তারুণ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এক নতুন ভারত গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন—“তরুণেরা আগুন ছড়িয়ে দেবে হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত আর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।”
(5) স্বামীজি মানুষ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন (১৮৯৭ খ্রি.)। যার দ্বারা তিনি যুবসমাজকে ভবিষ্যতের মানবসমাজের সেবা করার সুযোগ করে দিতে য়ছিলেন। স্বামীজি মনে করতেন একশো জন খাঁটি আদর্শবান যুবক একজোট হলে ভারতবর্ষ মুক্তি পাবেই।
>> মূল্যায়ন: স্বামীজির অনুপ্রেরণার জন্যই পরবর্তী সময়ে ভারতের বৈপ্লবিক আন্দোলনে যুবকরা দলে দলে যোগ দেয়। গোপাল হালদার লিখেছেন, “বাংলাদেশে যাকে অগ্নিযুগ বলে, তাঁর অগ্নিমস্তু কেউ যদি জাগিয়ে থাকেন তবে সে বিবেকানন্দ।"
9. টীকা লেখ : থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি।
উত্তর : থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি :
অর্থ: বিএস' (ঈশ্বর) ও 'সোফিয়া' (জ্ঞান)—এই দুটি গ্রিক শব্দের মিলিত রূপ হল। 'থিওসফি'। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ হল বিদ্যা। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ঠিক দার্শনিক ইয়ামেট্রিকস সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।
প্রতিষ্ঠা : সর্বপ্রথম আমেরিকার নিউইয়র্কে (১৮৭৫ খ্রি.) কর্নেল এইচ. এস. ওলকট ও মাদাম এইচ. পি. ব্লাডাউস্কি থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি গড়ে তোলেন। ঊনবিংশ শতকের ধর্ম ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে থিয়োজফিক্যাল সোসাইটির অবদান কম নয়। পরে তাঁরা মাদ্রাজের আরিয়ারে বিয়োজবিকাল সোসাইটির একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন (১৮৮৬ খ্রি.)। শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এই সোসাইটিতে যোগ দিলে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
>> উদ্দেশ্য: ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের প্রতি এঁদের গভীর আস্থা ছিল। এঁরা প্রাচীন হিন্দু, বৌধ ও পারসিক ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটানোর চেষ্টা করেন। এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল -
(1) সমস্ত মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা ;
(2) প্রাচীন ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শনের চর্চা করা;
(3) মানুষের মধ্যেকার আধ্যাত্বিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো এবং
(4) সতীদাহ, পণপ্রথা, জাতিভেদ প্রথা ইত্যাদির বিরোধিতা করা।
বিশ্বাসঃ থিয়োজফিস্টরা তিনটি সত্যে বিশ্বাস করতেন—
(1) আত্মা অমর ও শাশ্বত:
(2) মানুষের হৃদয়ে পরমাত্মার অধিষ্ঠান;
(3) মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তোলে।
প্রভাবঃ শ্রীমতী বেসান্ডের উদ্যোগে বারাণসীতে সেন্ট্রাল হিন্দু স্কুল স্থাপিত হয়। পরে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের চেষ্টায় এটি বারাণসীর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। পাশ্চাত্য বিয়োজটি হিন্দুধর্ম ও ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে তার পক্ষে প্রচার করলে ভারতীয়রা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
10. জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান কী ?
উত্তর : জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান :
বঙ্কিমচন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল স্বদেশ ও দেশস্লেন। সৃষ্টি জাতীয়তাবোধের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর 'বন্দেমাতরম্'-মন্ত্র ছিল বিপ্লবীদের বীজ। অরবিন্দ ঘোষ তাই বঙ্কিমকে ‘জাতীয়তাবোধের ঋত্বিক' বলেছেন।
● সাহিত্য:(1) ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ' উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি স্বাধীনতার পটভূমিকায় ইংরেজ বিরোধী সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে স্বদেশ চেতনার জাগরণ ঘটান। আনন্দমঠের সন্তানদলের মুখ দিয়ে তিনি স্বাদেশিকতা ও সংগ্রানশীল জাতীয়তাবোধের তত্ত্ব প্রচার করেন।
(2) ‘দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসেও তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের জাত্যভিমানকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।
(3) তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে 'সীতারাম', 'রাজসিংহ', 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রভৃতি স্বদেশপ্রেমের চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল।
(4) বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা', 'কৃষ্ণচরিত’, ‘ভারত কলঙ্ক’, ‘বাঙালির বাহুবল' প্রভৃতি প্রবন্ধে স্বদেশভাবনার পরিচয় মেলে।
সংগীত: বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্ সংগীত দেশবাসীকে স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সন্তানদলের সদস্যরা বন্দেমাতরম্ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে দেশের জন্য প্রাণবিসর্জন দেন। এই দৃষ্টান্ত সারা দেশকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয়তাবাদের মহারূপে সমাদৃত হয় এই সংগীতটি।
> মূল্যায়ন: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলি অগণিত ভারতবাসীর হৃদয়ে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছিল—যুবসমাজের মনে জ্বালিয়েছিল আত্মাহুতির বহ্নিজ্বালা। তাই হীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলিমকে ভারতীয় জাতীয়তাবোধের প্রকৃত জনক (The real father of Indian Nationalism) বলেছেন।
11. টীকা লেখ : দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন।
উত্তর : দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন :
পটভূমি: ঊনবিংশ শতকে দেশীয় সংবাদপত্রগুলিতে সরকারি কর্মচারীদের অন্যায় আচরণ, সাকারের অর্থনৈতিক শোষণ, দেশীয় সম্পদের বহির্গমন, দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় ইত্যাদি নানা বিষয় তুলে হা হয়। সমগ্র দেশবাসীর কাছে সরকারের অন্যায় নীতির মুখোশ খুলে যায়। ঐতিহাসিক এ. আর. দেশাইয়ের মতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সংবাদপত্র হল এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
> আইনের শর্তসমূহ: সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর জেনারেল লর্ড লিটন দেশীয় পত্রপত্রিকার কন্ঠরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে (১৪ মার্চ) দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন (NVernacular Press Act, 1878) জারি করেন। এই আইনে বলা হয় যে,
(1) সরকারবিরোধী কোনো সংবাদ বা রচনা প্রকাশ করলে ওই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শাস্তি পাবেন। এ ব্যাপারে বিচারবিভাগে কোনো অভিযোগ করা যাবে না।
(2) সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য সরকারের কাছে অর্থ জমা রাখতে বলা হয়। এ ছাড়া আরও বলা হয় যে, সরকার-বিরোধী মন্তব্য ছাপা হলে এই অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে।
(3)কোনো সরকারি কর্মচারী বিশেষ অনুমতি ছাড়া সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে পারবেন না।
>> ফলাফল: সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন জারি হলে 'সোমপ্রকাশ', 'সহচর' প্রভৃতি বহু জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই কালাকানুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শিশিরকুমার ঘোষ সম্পাদিত 'অমৃতবাজার পত্রিকা' শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ হতে থাকে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের এই প্রয়াসকে অনেকে শ্বাসরোধকারী আইন বলে নিন্দা করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড রিপন এই আইনটি প্রত্যাহার করে নেন (২৮ জানুয়ারি)।
12. সমাজ সংস্কারে রামমোহনের ভূমিকা উল্লেখ করো । উডের ডেসপ্যাচ কী ?
উত্তর : রামমোহনের সমাজসংস্কার :
রামমোহন ছিলেন ভারতের সর্বপ্রথম আধুনিক মানুষ যিনি চেতনার চাবুক হাতে নিয়ে পচাগলা এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
(1) সমাজসংস্কারের অঙ্গ হিসেবে রামমোহন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক রামমোহনের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহ নিবারণ আইন জারি করেন।
(2) সে যুগে বিদেশযাত্রা ছিল সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। তিনি নিজে বিদেশ যাত্রা করে এর বিরোধিতা করেন।
(3) তিনি বহু প্রবন্ধে কন্যাপণ, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের সমালোচনা করেন।
(iv) তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।
উডের ডেসপ্যাচ :
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড় ভারতে শিক্ষাবিস্তার সম্পর্কে এক নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এটিই উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) নামে খ্যাত। উডের ডেসপ্যাচে সুপারিশগুলি ছিল এরকম
(1) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার, স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন ;
(2) সাধারণভাবে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান এবং উচ্চ ইংরেজি শিক্ষণীয় বিষয়রূপে গুরুত্বান
(3) কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা
(4) বিদ্যালয়গুলিকে সরকারি সাহায্য বা অনুদান দেওয়া
(5) শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যাপারে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (Inspection)-এর নির্দেশ এই নির্দেশনামা অনুসারে একটি শিক্ষা বিভাগ (Department of Public Instruction) গঠিত হয় এবং কলকাতা, মাম্রাজ ও বোম্বাইতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।
13. ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার কী প্রভাব ছিল? বিধবা বিবাহ প্রচলনের কাজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা লেখ।
উত্তর: ভারতে পাশ্চাত্য-শিক্ষার প্রভাব:
পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের জনজীবনে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন। এর ফলে
(1.) পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসী মধ্যযুগীয় কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্ত হয়।
(2) পশ্চিমি দেশগুলির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ ভারতীয়দের মানসিক প্রসারতা ঘটায়।
(3) পাশ্চাত্য-শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল মানুষ ধর্ম ও সমাজসংস্কারের কাজে উদ্বুদ্ধ হন।
(4) যুক্তিবাদ ও উদারতাবাদের বিকাশ ভারতবাসীকে রুমে জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হতে প্রেরণা দেয়। তবে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ত্রুটিহীন ছিল না। ইংরেজি শিক্ষা কেবল শহুরে অভিজাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিধবাবিবাহ প্রচলনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা :
নারীমুক্তি আন্দোলনের কাজে বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের যোগ্য উত্তরসাধক। হিন্দুবিধবাদের দুঃখদুর্দশা তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে। বিধবাদের মুক্তির জন্য বিভিন্ন শাস্ত্র বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত।
(1) পরাশর সংহিতা-র একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে, “স্বামী নিরুদ্দেশ হলে, মারা গেলে, ক্লীব প্রমাণিত হলে, সংসারধর্ম ত্যাগ করলে কিংবা পতিত হলে তাঁর স্ত্রী পুনর্বিবাহ করার অধিকারী।"
(2) বিদ্যাসাগর প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন (৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ খ্রি.)। পার ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন আর পাত্রী ছিলেন বর্ধমানের পালানাডাঙার ব্রহ্মানন্দ মুখার্জির দশ বছর বয়সি বিধবা কালীমতী দেবী।
(3)) তিনি নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সাথে আঠারো বছরের এক বিধবা ভবসুন্দরীর বিবাহ দেন।
(4) তিনি এগারো বছরের মধ্যে (১৮৫৬-৬৭) মোট ৬০ জন বিধবার বিয়ে দিয়েছিলেন। এজন্য তাঁর খরচ হয়েছিল ৮২ হাজার টাকা।
> ফলাফল: ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিধবাবিবাহ ‘আইনসিদ্ধ’ বলে ঘোষিত হয়। গোঁড়া ও রক্ষণশীল সমাজের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে বিদ্যাসাগর যেভাবে একক প্রচেষ্টায় বিধবাদের বিবাহের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা ভারতীয় হিন্দুসমাজের নারীদের জীবনের এক বিশেষ মোড় বলা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনই প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন।" বিদ্যাসাগর নিজে তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্রকে এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, “বিধবাবিবাহ প্রথা প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম।”
14. সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো।
উত্তর : সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগরের অবদান শতকের আর-একজন অসাধারণ পণ্ডিত ও সংস্কারক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ ৯১ খ্রি.)। মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক দরিত ব্রা পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। প্রখ্যাত কবি মাইকেল মধুসুদন লিখেছেন, বিদ্যাসাগরের মধ্যে ছিল সন্ন্যাসীর প্রজ্ঞা, ইংরেজের উদ্যম এবং বাঙ্গালী-মায়ের কোমল হৃদয় ("Vidyasagar had the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengalee mother)!
বিধবাবিবাহ আইন: নারীমুক্তি আন্দোলনের কাজে বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের যোগ্য উত্তরসাধক। হিন্দুবিধবাদের দুঃখদুর্দশা তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে। বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে যান। বিভিন্ন শাস্ত্র বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। পরাশর সংহিতার একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে, স্বামী নিরুদ্দেশ হলে, মারা গেলে, ক্লীব প্রমাণিত হলে, সাথে করলে কিংবা পতিত হলে তাঁর স্ত্রী পুনর্বিবাহ করার অধিকারী।" তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে রক্ষণশীল সমাজপতিরা নানাভাবে বিদ্যাসাগরকে লাঞ্ছিত কিন্তু জীবন বিপ করেও তিনি এই আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাাই XV রেগুলেশন দ্বারা বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়। তার উদ্যোগে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ৬০টি হি অনুষ্ঠিত হয়।
বাল্যবিবাহের বিরোধিতাঃ বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্ম বা হিন্দুশাস্ত্রে বাল্যবিবাহের কোনো বিধান নেই। 'সর্বশূভকরী' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (১৮৫ খ্র.) তিনি 'বাল্যবিবাহের দোষ" নামক একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই লেখায় তিনি হিন্দু বাল্যবিবাদের অসহায়তা, দুঃসহ যন্ত্রনা, দ্য জীবনের মর্মব্যাথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি বাল্যবিবাহের বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন এবং সভাসমিতিতে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে সরকার একটি আইন পাস করে মেয়েদের বিবাহের বয়স কমপক্ষে ১০ বছর করে।
(1) বহুবিবাহের বিরোধিতা। সে সময়ে হিন্দু সমাজের বুকে বহুবিবাহ প্রথা আলাদল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। বিদ্যাসাগর আগাগোড়া বহুবিবাহের বিরোধিতা করে গেছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রায় ৫০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসহ এক প্রতিবাদপত্র পাঠান ব্রিটিশ সরকার কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ ব্যাপারে সরকারি ভরকে সেসময়ে কোনো সাড়া মেলেনি। কিন্তু বিদ্যাসাগর থেমে থাকেননি। তিনি বহুবিবাহের বিরোধিতা করে আরও দুটি পুস্তক রচনা করেন (১৮৭১ খ্রি.)।
(2) কুলীন প্রথার বিরোধিতা : সে সময় কুলীন ব্রাণেরা অজস্র বিবাহ করতেন, এমনকি বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বহু কুলীন ব্রায়ণ কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাদের কন্যাদায় থেকে মুক্তি দেওয়ার অছিলায় তাদের নাতনির বয়সি মেয়েদের বিবাহ করবেন। এই ভঙানি বন্ধ করার জন্য বিদ্যাসাগর কুলীন বিরুদ্ধে সরব হন।
> অন্যান্য সমাজসংস্কার: বিদ্যাসাগরের অন্যান্য সমাজসংস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
(1) তিনি মদ্যপানের বিরুদ্ধেও সম্ভব হন।
(2)এ ছাড়া সহবাস সম্মতি' আইনের জন্যও তাঁর অবদান ছিল।
(3) গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রথা ও কুষ্ঠরোগী হত্যার বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন।
(4) জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা প্রথার তিনি তীব্র নিন্দা করেন এবং এর বিরুদ্ধে তিনি সকলকে সরব হওয়ার আবেদন জানান।
> মূল্যায়ন: স্বামী বিবেকানন বলেছিলেন, রামকৃষ্ণদেবের পর আমি বিন্যাসরকে অনুসরণ AfterRamakrishna, I follow Vidyasagar) |বিদ্যাসাগরের চরিত্র ছিল কুসুনের মতো কোমল, মবার বলের মতোই কঠোর। ন্যায় ও সত্যের প্রতি তিনি যতটা অনুষ্যত ছিলেন, ঠিক ততটাই প্রতিবাদী ছিলেন চনায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। তাই গবেষক বিনয় ঘোষ লিখেছেন, "রামমোহনের মত আদর্শদী (Idealist) কুরমোহনের মত চরমপন্থী (extremist) কোনটাই বিদার ছিলেন না। সমকালীন সময়ে তিনি ছিলেন সত্যকার বাস্তববাদী (realist)। আদর্শবাদের সাথে বাস্তববাদের যে সমন্বয় তাঁর চরিত্রেই তেমনি আর কারো চরিত্রে ঘটেনি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন