Breaking

ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

এপ্রিল ১৪, ২০২২

কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ (protest and rebellions against the rule of the company in Bengali)

 

                     কোম্পানির শাসনের                  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ


1. চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ কী ছিল ?

উত্তর: ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর জঙ্গলমহলে জোর করে রাজস্ব আদায় করলে চুয়াড় বিদ্রোহ হয়। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে চুয়াড় বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল।


2. ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বিধর্মী ইংরেজ শাসিত ভারতকে  বা দার -উল - ইসলাম বা ধর্মরাজ্যে পরিণত করা। অবশ্য ধর্মীয় উদ্দেশ্যে শুরু হলেও পরবর্তীকালে এটি রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।


3. তিতুমির কেন বিখ্যাত ?

উত্তর: বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন তিতুমির। তিনি নিজেকে স্বাধীন বাদশাহো বলে ঘোষণা করেন। নারকেলবেড়িয়াতে বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


4.  রানী লক্ষ্মীবাঈ স্মরণীয় কেন ?

উত্তর: ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ঝাঁসি দখল করতে চাইলে লক্ষ্মীবাঈ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।


5. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ফলে- ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটেছিল। ভারত শাসন আইন পাস করে ভাইসরয়ের আইন পরিষদে ভারতীয় সদস্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।


6. সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:  সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব : 


১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পূর্ববর্তীকালে ভারতে সংঘটিত ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনগুলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ (১৮৫৫ খ্রি.)। আপাত ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল নিম্নরূপ-


(1) সরকার সাঁওতালদের জন্য ভাগলপুর ও বীরভূম জেলার কিছু অংশ নিয়ে সাঁওতাল পরগনা নামে একটি পৃথক অঞ্চল গঠন করে। সেই সঙ্গে এই অঞ্চলে সাঁওতালদের নিজস্ব আইন বলবৎ করা হয়।


(2) সাঁওতালদের অভাব-অভিযোগের প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।


(3) এই বিদ্রোহ কৃষক তথা সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায়। যা পরবর্তীকালে মহাবিদ্রোহের পথ প্রশস্ত করে।


(4) এই বিদ্রোহের ফলে জমিদারি ও মহাজনি শোষণ সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।


বিশিষ্ট লেখক সুপ্রকাশ রায় বলেছেন যে, সাঁওতালদের গণজাগরণ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারও মনে করেন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের তুলনায় ১৮৫৫-র সাঁওতাল বিদ্রোহ কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনি লিখেছেন—১৮৫৭-র বিদ্রোহকে যদি ভারতবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা হয়, তাহলে সাঁওতাল বিদ্রোহেরও সে মর্যাদা পাওয়া উচিত।


7. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ কী ছিল ?

উত্তর:  ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ :


১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের পশ্চাতে ধর্মীয় কারণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

 (1) খ্রিস্টান মিশনারিরা ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে ভারতীয়দের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করত। সরকারি দপ্তর, জেলখানা, বিদ্যালয় প্রভৃতি সমস্ত জায়গায় ছিল এদের অবাধ গতি। সরকার প্রকাশ্যেই এদের কাজে মদত দিত।


(2) হিন্দু ও ইসলাম ধর্মকে নানাভাবে বিদ্রুপ করে মিশনারিরা খ্রিস্টানধর্মের মহত্ত্ব প্রচার করত।


 (3) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট সম্রাট বাহাদুর শাহ 'আজমগড় ঘোষণাপত্র জারি করেন। এই ঘোষণাপত্র সিপাহিদের উদ্বুদ্ধ করে। তারা মনে করে যে, ইংরেজ শাসন ধ্বংস হলে তারা ধর্মান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হবে।


(4) কোম্পানির পরিচালক সভার প্রধান ম্যাঙ্গেলস বলেছিলেন (১৮৫৭ খ্রি.), সমগ্র ভারতে খ্রিস্টের পতাকা উড্ডীন রাখতে হবে এবং ভারতকে একটি খ্রিস্টান দেশে পরিণত করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। ধর্মভীরু ভারতবাসীর কাছে এই ধরনের ঘোষণা ছিল মৃত্যুদণ্ডের সমান।


 (5) বিদ্রোহীদের সম্পর্কে সি. বল বলেছেন যে, ধর্মরক্ষার তাগিদেই তাঁরা ইংরেজদের কোতল করতে নেমেছিলেন। অধিকাংশ পণ্ডিত ধর্মীয় ভীতি ও অসন্তোষকে মহাবিদ্রোহের অন্যতম  কারণ বলে মেনে নিয়েছেন।


8.  ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি উল্লেখ করো।

উত্তর : মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ভারতীয়দের মধ্যে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বিদ্রোহ দমিত হয়েছিল। এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি হল-

(1) ভারতের সব অঞ্চলের সিপাহি এবং জনগণ বিদ্রোহে যোগদান করেনি।


(2) বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে সংহতির অভাব ছিল। তারা সংঘবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে আন্দোলন করেনি। 

(3) শিখ, গুর্খা, রাজপুত, মারাঠা প্রভৃতি জাতি এবং আফগানিস্তান, কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ প্রভৃতি রাজ্য বিদ্রোহ দমন করতে ইংরেজদের সাহায্য করেছিল।


(4) ভারতীয় রাজারাও অনেকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করেন।


(5) বিদ্রোহীদের ব্যর্থতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল অস্ত্র, অর্থ ও দক্ষতার অভাব। বিদ্রোহীদের দক্ষতার তুলনায় আবেগ ছিল বেশি। তা ছাড়া তাদের লড়াই করতে হচ্ছিল অর্থে ও অস্ত্রে বলীয়ান ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে, ফলে তাদের পরাজয় স্বাভাবিক ছিল।


(5) এইচ. টি. ল্যামব্রিক বলেছেন, বিদ্রোহীদের সেনাবাহিনী ইউরোপীয় সেনাবাহিনী তথা রণকৌশলকে অন্ধভাবে অনুকরণ করত। এটি ছিল বিদ্রোহীদের অসম্ভব দুর্বলতা যা ইংরেজবাহিনীকে রণক্ষেত্রে সুবিধাজনক ও অনুকূল পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছিল।


9. ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর : সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ: 

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পূর্বে সংগঠিত প্রতিবাদী আন্দোলনগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সাঁওতাল উপজাতির অভ্যুত্থান (১৮৫৫ খ্রি.)। এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল বহুদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।


1.রাজস্বের চাপ:  ভারতের প্রাচীনতম আদিবাসী সাঁওতালরা স্বভাবগতভাবে সৎ, পরিশ্রমী ও সাহসী। কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করলে বহু সাঁওতাল বাস্তুচ্যুত হয়। তারা রাজমহলের পার্বত্য অঞ্চলে এসে নতুন বাসা বাঁধে এবং রুক্ষ মাটিকে কৃষিকাজের উপযুক্ত করে জীবনধারণ করতে থাকে। এই অঞ্চল 'দামিন-ই-কোহ' নামে পরিচিত হয়। কিন্তু কিছুদিন পরে সরকার এই অঞ্চলকেও জমিদারি বন্দোবস্ত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে আবার সাঁওতালদের ওপর রাজস্বের বোঝা চাপে। এতে তারা ক্ষুর ও বিদ্রোহমুখী হয়।


2. মহাজনি শোষণ:  কালক্রমে দামিন-ই-কোহ-তে মহাজনদের আবির্ভাব ঘটে। এইসব ধূর্ত ও অর্থলোভী ব্যবসায়ী, মহাজনরা সহজসরল সাঁওতালদের শোষণ করতে শুরু করে। ঋণের জালে সাঁওতালদের জড়িয়ে তারা মুনাফা লুটতে থাকে। রাজস্ব প্রদান এবং খাদ্যাভাব মেটাতে বহু সাঁওতাল পরিবার ঋণ নিতে বাধ্য হয়। চড়া সুদের বিনিময়ে এই ঋণ নেওয়ার ফলে তারা আরও বিপদে পড়ে। বহু সাঁওতাল ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের শেষ সম্বল কৃষিজমিটুকু মহাজনদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। একবার ঋণ নিলে সেই ঋণ শোধ করতে হত বংশপরম্পরায়। এই জাল থেকে মুক্তির আশায় তারা বিদ্রোহী হয়।


3 .নীলকরদের শোষণ:  সাঁওতালদের ক্ষোভের আর-একটি কারণ ছিল নীলকর সাহেবদের শোষণ ও অত্যাচার। নীলচাষ করার ফলে ওই অঞ্চলে খাদ্যাভাব ঘটে। আবার নীলচাষ করতে অস্বীকার করলে নীলকর সাহেবরা নিরীহ সাঁওতালদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করত। এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাঁওতালরা বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।


4.সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচার: সরকারি প্রশাসন ও বিচারবিভাগ অন্যায়ভাবে জমিদার,মহাজন ও ব্যবসায়ীদের সমর্থন করে। উপজাতিভুক্ত সাঁওতালদের 'সভ্যতার লজ্জা' মনে করে উদ্ধৃত ইংরেজ কর্মচারীরাও সাঁওতালদের ওপর অত্যাচার চালাতে থাকে। নিরীহ সাঁওতাল উপজাতি দেশের বিচারবিভাগের কাছ থেকেও কোনো সাহায্য পায়নি। এই সার্বিক শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের পথই বেছে নেয়।


5.রেল-কর্মচারীদের অত্যাচার: আঠারো শতকে তিলা পাহাড়, ভাগলপুর অঞ্চলে রেললাইন। পাতার কাজ শুরু হয়। এই কারণে বহু রেল-কর্মচারী 'দামিন-ই-কোহ’-তে আসে। তারা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে দরিদ্র সাঁওতালদের কাছ থেকে অল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে হাঁস, মুরগি, ছাগল, ফলমূল নিতে শুরু করে, এমনকি সাঁওতাল রমণীদের প্রতিও তারা অসভ্য আচরণ করে। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে সাঁওতাল সমাজ ভদ্রলোক-বিরোধী বা দিকু-বিরোধী আন্দোলন শুরু করে।


6. সিধু ও কানহুর নেতৃত্ব: জমিদার, মহাজন ও ইংরেজের অত্যাচারের প্রতিবাদে সাঁওতালরা সংঘবদ্ধ হয়। সাঁওতালদের সংগঠিত করার কাজে মুখ্য ভূমিকা নেন সিধু ও কানহু নামে দুই ভাই। তারা দুজনেই ছিলেন সাহসী ও দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতির মানুষকে সংগঠিত করার জন্য সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে শালগাছের ডাল' পাঠানো হয়। ১৮৫৫-এর ৩০ জুন প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল উগনাডিহি-র মাঠে মিলিত হয়। সিধু-কানহুর নেতৃত্বে ক্ষিপ্ত সাঁওতালরা পাঁচকাঠিয়া বাজারে উপস্থিত হয়। পাঁচজন স্থানীয় মহাজন ও দিঘী থানার অত্যাচারী দারোগাকে হত্যা করে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়।

শত শত সাঁওতাল যুবক তীর-ধনুক নিয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দ্রুত বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সরকার বিদ্রোহী  সাঁওতালদের দমন করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়। ইংরেজ বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার সাঁওতাল। সিধু কানহুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বহু বন্দী সাঁওতালকে ফাঁসি দেয়া হয়।


সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পূর্ববর্তীকালে ভারতে সংঘটিত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গুলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ। আপাত ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল নিম্নরূপ-

1. সরকার সাঁওতালদের জন্য ভাগলপুর বীরভূম জেলার কিছু অংশ নিয়ে সাঁওতাল পরগনা নামে একটি পৃথক অঞ্চল গঠন করে। সেই সঙ্গে এই অঞ্চলে সাঁওতালদের নিজস্ব আইন বলবৎ করা হয়।

2. সাঁওতালদের অভাব-অভিযোগের প্রতি দৃষ্টি রাখার জন্য সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

3. এই বিদ্রোহ কি সত্য তা সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জোগায়, যা পরবর্তীকালে মহাবিদ্রোহের পথ প্রশস্ত করে।

4. এই বিদ্রোহের ফলে জমিদারি ও মহাজনি শোষণ সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।


10. তিতুমিরের আন্দোলনের প্রকৃতি কী ছিল?

উত্তর: তিতুমিরের বিদ্রোহ নিছক ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ অথবা কৃষকবিদ্রোহ ও ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল কি না তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ এটিকে বিশুদ্ধ সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলেছেন। আবার কারও মতে এটি ছিল কৃষকদের শোষণমুক্তির আন্দোলন।


(1) রমেশচন্দ্র মজুমদার একে মুসলিমদের জন্য, মুসলিমদের দ্বারা, মুসলিম কর্তৃক আন্দোলন বলে উল্লেখ করেছেন।


(2) অভিজিৎ দত্ত বলেছেন যে, বারাসত বিদ্রোহ ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় ভাবধারার সমান্তরাল আন্দোলন।


(3) থনটন , হান্টার প্রভৃতি লেখকের মতে, এই আন্দোলন সাম্প্রদায়িক ছিল না। কারণ ওয়াহাবিরা মুসলিম জমিদারদেরও আক্রমণ করেছিল, আবার নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর তারা কোনোরকম অত্যাচার করেনি।


(4) নরহরি কবিরাজ এই আন্দোলনকে কৃষকদের শ্রেণিসংগ্রাম বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ তিতুমিরের বিদ্রোহ ছিল জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে।


(5) তিতু নিজেকে 'বাদশাহ' বলে ঘোষণা করলে ইংরেজের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ বাধে। এইদিক থেকে বিচার করলে ওয়াহাবিদের সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রামও বলা যায়।


11. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণ উল্লেখ করো।

উত্তর : মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ : 

জনগণের ক্ষোভের সবচেয়ে বড়ো কারণ ছিল ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষণ। কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, জোতদার, জমিদার কেউ রেহাই পায়নি এই শোষণ থেকে।

(1) পলাশির যুদ্ধের পর শুরু হয় ইংরেজের নির্লজ্জ লুণ্ঠন। ভারতবর্ষ থেকে প্রভূত সোনা, রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু তারা ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়।

(2) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষকশ্রেণির দুঃখ-দুর্দশা চরমে নিয়ে যায়। অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ এবং রাজস্ব আদায়কারীদের নিপীড়ন তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। একদিকে জমিদার ও

অন্যদিকে মহাজনদের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হয়।

(3) কৃষকশ্রেণির পাশাপাশি শিল্পী ও কারিগররাও সর্বনাশের মুখে এসে দাঁড়ায়। ইংল্যান্ডের কলে তৈরি কাপড়ের সঙ্গে ভারতের তাঁতে তৈরি কাপড়ের অসম প্রতিযোগিতায় পিছু হটে ভারতীয়।দ্রব্য। ফলে ভারতের সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প ধ্বংস হয়।


(4) ইংল্যান্ড থেকে প্রেরিত দ্রব্যের আমদানিশুল্ক কমিয়ে এবং ভারতীয় দ্রব্যের রপ্তানিশুল্ক বাড়িয়ে তারা ভারতীয় দ্রব্যের ব্যাবসা প্রায় বন্ধ করে দেয়।


মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ: ভারতীয় সিপাহীদের অসন্তোষ ছিল মহা বিদ্রোহের অন্যতম কারণ। সমসাময়িক একজন ইংরেজ লিখেছেন-ভারতীয় সিপাহি ও ব্রিটিশ কর্মচারীর মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব  বা সহমর্মিতাবোধ ছিল না দু'দলই যেন ছিল পরস্পরের বিচ্ছিন্নন ও অপরিচিত।

1. বিভিন্ন সময়ে সরকারের কিছু কিছু নির্দেশ ধর্মভীরু সিপাহীদের শংকিত করেছিল। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের তিলক কাটা ও মুসলমানদের দাড়ি রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ১৮২৪ - সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ব্রম্ভ যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশও সিপাহীদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করে। কারণ সেই সময় সমুদ্রযাত্রা হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল।

2. চাকুরী সংক্রান্ত কিছু নির্দেশ সিপাহীদের বিদ্রোহীমুখী  করেছিল ।১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল সার্ভিস এনলিস্টমেন্ট আইন জারি করে ভারতের মধ্যে বাইরে যে কোনো স্থানে সিপাহীদের যুদ্ধে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আইন সিপাহীদের দারুন ক্ষুব্দ করে।

3. ইংরেজ সৈনিকের তুলনায় সিপাহীদের বেতন ছিল কম। সম যোগ্যতা থাকলেও ভারতীয়দের পদোন্নতির সুযোগ ছিল না। ইংরেজ সৈনিকের তুলনায় তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল নিকৃষ্ট। অধিকাংশ সময়ই সিপাহীদের শুয়োর, নিগার ইত্যাদি গালিগালাজ দিয়ে কথা বলা হত। এই হীনতার বোঝা বহন করা একসময় ভারতীয় সিপাহীদের কাছে দুঃসহ হয়ে ওঠে।








বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

এপ্রিল ১৩, ২০২২

দশম শ্রেণির ইতিহাস_জাতীয়তাবাদ ও সংস্কার আন্দোলন (Nationalism and reform movement in Bengali Class-10)

  

            জাতীয়তাবাদ ও সংস্কার                           আন্দোলন


1. শুদ্ধি আন্দোলন বলতে কী বোঝো ?

উত্তর : ব্যাপক ধর্মান্তরের ফলে হিন্দু সমাজে ভাঙ্গন দেখা দেয়। হিন্দু সমাজকে এই ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার জন্য আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী অহিন্দু ও ধর্মান্তরিত হিন্দুদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য যে কর্মসূচি গ্রহণ করেন তা শুদ্ধি আন্দোলন নামে পরিচিত।


2. ডিরোজিও স্মরণীয় কেন ?

উত্তর : নব্য বঙ্গ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনি উনিশ শতকের কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কাকে ভারতের প্রথম জাতীয়তাবাদী কবি বলা হয়।


3. আর্য সমাজ আন্দোলনর প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল ?

উত্তর: আর্য সমাজ আন্দোলনর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বেদভিত্তিক সমাজ গঠন ও হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া, অহিন্দু ও ধর্মান্তরিত হিন্দুদের হিন্দু ধর্মে ফিরে আনাও আর্য সমাজের অপর উদ্দেশ্য ছিল।


4. পথের দাবী ও নীলদর্পণ কে রচনা করেন ?

উত্তর : পথের দাবী রচনা করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নীলদর্পণ রচনা করেন দীনবন্ধু মিত্র।


 5. ইলবার্ট কে ছিলেন ? ইলবার্ট বিলের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল ?

উত্তর : ইলবার্ট ছিলেন লর্ড রিপনের আইন সচিব।

ইলবার্ট বিলের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ যাতে ইউরোপীয় বিচারকের মর্যাদা লাভ করে ইউরোপীয় অপরাধীর বিচার করতে পারে তার আইনগত ব্যবস্থা করা, অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ বিচারপতিদের মধ্যে আইনগত বৈষম্য দূর করা।


6. টীকা লেখ : মেকলের প্রতিবেদন।

উত্তর : মেকলের প্রতিবেদন বা মেকলে মিনিটস

পাশ্চাত্য সমর্থকদের মতে লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারতের গভর্নর-জেনারেল নিযুক্ত হলে (১৮২৮-৩৫ খ্রি.) এদেশে পাশ্চাত্য-শিক্ষা প্রসারের পথ প্রশস্ত হয়। টমাস ব্যাবিংটন মেকলে-কে 'পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটির সভাপতি নিয়োগ করেন বেন্টিঙ্ক। মেকলে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রসারের সপক্ষে বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন (১৮৩৫ খ্রি.)। এই প্রতিবেদন ‘মেকলে মিনিটস্’ (Macaulay Minutes) নামে খ্যাত।


বিভিন্ন প্রস্তাব: মেকলে মিনিটসের বিভিন্ন প্রস্তাবে বলা হয় চৈত. প্রাচ্যের সভ্যতা দুর্নীতিগ্রস্ত, অনুন্নত ও নির্বুদ্ধিতাসম্পন্ন, (II) প্রাচ্য-শিক্ষা নিকৃষ্ট ও বৈজ্ঞানিক চেতনাহীন, (iii) প্রাচ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটতে পারে একমাত্র পাশ্চাত্য-শিক্ষার হাত ধরেই। মেকলে বলেন, ভারতীয়দের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য-শিক্ষা দিলে, তাদের মাধ্যমে আরও বহু ভারতীয় পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ সীমিত সংখ্যক পাশ্চাত্য-শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্য দিয়ে পরিত হয়ে ইংরেজি শিক্ষা জনগণের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে যাবে—এই নীতি ইনফিলট্রেশন থিয়োরি (Infiltration theory) নামে পরিচিত। মেকলে দম্ভভরে বলেছিলেন, এক আলমারি পাশ্চাত্য পুস্তক থেকে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, প্রাচ্যের সমস্ত গ্রন্থাগার ঘাঁটলেও তা পাওয়া যাবে না।


 মন্তব্য: মেকলের প্রতিবেদনের ফলেই ভারতে ইংরেজি শিক্ষার দ্বার খুলে যায়। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ মার্চ এই প্রস্তাব সরকারের অনুমোদন পায়।


7. প্রার্থনা সমাজের আদর্শ ও লক্ষ্য কী ছিল ? 

 উত্তর  :  প্রার্থনা সমাজের আদর্শ ও লক্ষ্য :

ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ড. আত্মারাম পাণ্ডুরা মহারাষ্ট্রে প্রার্থনাসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর প্রার্থনাসমাজে যোগ দেন ও একে একটি শক্তিশালী সমাজসংস্কারক প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তোলেন।


>> আদর্শ: প্রার্থনাসমাজের সদস্যরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতেন। তবে ব্রাহ্মসমাজের মতো এঁরা কোনো নতুন ধর্মমতের কথা প্রচার করেননি। এঁরা বেদকে অভ্রান্ত বা অপরিবর্তনীয় বলে মনে করতেন না। পাশ্চাত্য আদর্শ ও ভাবধারায় প্রভাবিত হলেও এই সংগঠনটি সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি ও রীতিনীতি মেনে কাজ করায় বিশ্বাসী ছিল। প্রার্থনা সমাজ সমগ্র মানবজাতির ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের স্বপক্ষে এবং জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতার নীতিতে আস্থাশীল ছিল।


>> লক্ষ্য: হিন্দুধর্ম ও সমাজের মধ্যে থেকে ধর্ম ও সমাজের সংস্কার করাই ছিল এঁনের লক্ষ্য।

(1) প্রার্থনাসমাজের সদস্যরা জন্মান্তরবাদ ও পৌত্তলিকতাবাদের অবসানসহ বিভিন্ন কুসংস্কারের। বিলুপ্তির মাধ্যমে হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। 

(2) জাতিভেদ প্রথার অবসান এবং পুরোহিতদের প্রাধান্য খর্ব করা ছিল এই সমাজের লক্ষ্য।

 (3) বিধবাবিবাহ প্রচলন, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, পর্দাপ্রথার অবসান, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা ইত্যাদি ছিল প্রার্থনাসমাজের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।


8. স্বামী বিবেকানন্দ যুব শক্তিকে কিভাবে উদ্দীপিত করেন ?

উত্তর : স্বামী বিবেকানন্দ ও যুব শক্তি :

স্বামী বিবেকানন্দের নানা প্রবন্ধ ও বক্তৃতা তরুণ দেশপ্রেমিকদের মধ্যে উদ্দীপনার সম্ভার করে। অধঃপতিত ভারতবাসীকে তিনি আবুবলে বলীয়ান হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। স্বামীজী পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে বলেছিলেন।


(1) হতাশাগ্রস্ত যুবসমাজকে তিনি দেশের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের যুবশক্তি জাগ্রত না-হলে দেশ ও সমাজের মঙ্গলসাধন সম্ভব নয়। তাই তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ডাক দেন, “ওঠো, জাগো লক্ষ্যে পৌঁছোবার আগে থেমো না।”

(2) স্বামীজী সকলকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দৃঢ়তা, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর মনোবল রপ্ত করার পরামর্শ দেন।

 (3) জাতিভেদ, ধর্মীয় কুসংস্কার, সামাজিক অনাচার, অশিক্ষা, অসাম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য তিনি তরুণ সমাজকে উদ্দীপিত করেন। 

(4) স্বামীজি তারুণ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এক নতুন ভারত গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন—“তরুণেরা আগুন ছড়িয়ে দেবে হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত আর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।”


(5) স্বামীজি মানুষ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন (১৮৯৭ খ্রি.)। যার দ্বারা তিনি যুবসমাজকে ভবিষ্যতের মানবসমাজের সেবা করার সুযোগ করে দিতে য়ছিলেন। স্বামীজি মনে করতেন একশো জন খাঁটি আদর্শবান যুবক একজোট হলে ভারতবর্ষ মুক্তি পাবেই।


>> মূল্যায়ন: স্বামীজির অনুপ্রেরণার জন্যই পরবর্তী সময়ে ভারতের বৈপ্লবিক আন্দোলনে যুবকরা দলে দলে যোগ দেয়। গোপাল হালদার লিখেছেন, “বাংলাদেশে যাকে অগ্নিযুগ বলে, তাঁর অগ্নিমস্তু কেউ যদি জাগিয়ে থাকেন তবে সে বিবেকানন্দ।"


9. টীকা লেখ : থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি

উত্তর : থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি :

অর্থ:  বিএস' (ঈশ্বর) ও 'সোফিয়া' (জ্ঞান)—এই দুটি গ্রিক শব্দের মিলিত রূপ হল। 'থিওসফি'। সংস্কৃত ভাষায় এর অর্থ হল বিদ্যা। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ঠিক দার্শনিক ইয়ামেট্রিকস সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।


প্রতিষ্ঠা : সর্বপ্রথম আমেরিকার নিউইয়র্কে (১৮৭৫ খ্রি.) কর্নেল এইচ. এস. ওলকট ও মাদাম এইচ. পি. ব্লাডাউস্কি থিয়োজফিক্যাল সোসাইটি গড়ে তোলেন। ঊনবিংশ শতকের ধর্ম ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে থিয়োজফিক্যাল সোসাইটির অবদান কম নয়। পরে তাঁরা মাদ্রাজের আরিয়ারে বিয়োজবিকাল সোসাইটির একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন (১৮৮৬ খ্রি.)। শ্রীমতী অ্যানি বেসান্ত ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এই সোসাইটিতে যোগ দিলে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।


>> উদ্দেশ্য: ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের প্রতি এঁদের গভীর আস্থা ছিল। এঁরা প্রাচীন হিন্দু, বৌধ ও পারসিক ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটানোর চেষ্টা করেন। এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল -


(1) সমস্ত মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা ; 


(2) প্রাচীন ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শনের চর্চা করা;


(3) মানুষের মধ্যেকার আধ্যাত্বিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটানো এবং


(4) সতীদাহ, পণপ্রথা, জাতিভেদ প্রথা ইত্যাদির বিরোধিতা করা।


বিশ্বাসঃ থিয়োজফিস্টরা তিনটি সত্যে বিশ্বাস করতেন—


(1) আত্মা অমর ও শাশ্বত:

(2) মানুষের হৃদয়ে পরমাত্মার অধিষ্ঠান;

(3) মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে তোলে। 

প্রভাবঃ শ্রীমতী বেসান্ডের উদ্যোগে বারাণসীতে সেন্ট্রাল হিন্দু স্কুল স্থাপিত হয়। পরে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের চেষ্টায় এটি বারাণসীর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। পাশ্চাত্য বিয়োজটি হিন্দুধর্ম ও ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে তার পক্ষে প্রচার করলে ভারতীয়রা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।


10. জাতীয়তাবাদের  বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান কী ?

উত্তর : জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান :

বঙ্কিমচন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল স্বদেশ ও দেশস্লেন। সৃষ্টি জাতীয়তাবোধের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর 'বন্দেমাতরম্'-মন্ত্র ছিল বিপ্লবীদের বীজ। অরবিন্দ ঘোষ তাই বঙ্কিমকে ‘জাতীয়তাবোধের ঋত্বিক' বলেছেন।


সাহিত্য:(1) ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ' উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি স্বাধীনতার পটভূমিকায় ইংরেজ বিরোধী সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে স্বদেশ চেতনার জাগরণ ঘটান। আনন্দমঠের সন্তানদলের মুখ দিয়ে তিনি স্বাদেশিকতা ও সংগ্রানশীল জাতীয়তাবোধের তত্ত্ব প্রচার করেন।

(2) ‘দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসেও তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের জাত্যভিমানকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। 

(3) তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে 'সীতারাম', 'রাজসিংহ', 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রভৃতি স্বদেশপ্রেমের চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল।

(4) বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা', 'কৃষ্ণচরিত’, ‘ভারত কলঙ্ক’, ‘বাঙালির বাহুবল' প্রভৃতি প্রবন্ধে স্বদেশভাবনার পরিচয় মেলে।


 সংগীত: বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্ সংগীত দেশবাসীকে স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সন্তানদলের সদস্যরা বন্দেমাতরম্ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে দেশের জন্য প্রাণবিসর্জন দেন। এই দৃষ্টান্ত সারা দেশকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয়তাবাদের মহারূপে সমাদৃত হয় এই সংগীতটি।


> মূল্যায়ন: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলি অগণিত ভারতবাসীর হৃদয়ে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছিল—যুবসমাজের মনে জ্বালিয়েছিল আত্মাহুতির বহ্নিজ্বালা। তাই হীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলিমকে ভারতীয় জাতীয়তাবোধের প্রকৃত জনক (The real father of Indian Nationalism) বলেছেন।


11. টীকা লেখ : দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন।

উত্তর : দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন : 

পটভূমি:  ঊনবিংশ শতকে দেশীয় সংবাদপত্রগুলিতে সরকারি কর্মচারীদের অন্যায় আচরণ, সাকারের অর্থনৈতিক শোষণ, দেশীয় সম্পদের বহির্গমন, দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় ইত্যাদি নানা বিষয় তুলে হা হয়। সমগ্র দেশবাসীর কাছে সরকারের অন্যায় নীতির মুখোশ খুলে যায়। ঐতিহাসিক এ. আর. দেশাইয়ের মতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে সংবাদপত্র হল এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


> আইনের শর্তসমূহ: সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর জেনারেল লর্ড লিটন দেশীয় পত্রপত্রিকার কন্ঠরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে (১৪ মার্চ) দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন (NVernacular Press Act, 1878) জারি করেন। এই আইনে বলা হয় যে,


(1) সরকারবিরোধী কোনো সংবাদ বা রচনা প্রকাশ করলে ওই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শাস্তি পাবেন। এ ব্যাপারে বিচারবিভাগে কোনো অভিযোগ করা যাবে না।


(2) সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য সরকারের কাছে অর্থ জমা রাখতে বলা হয়। এ ছাড়া আরও বলা হয় যে, সরকার-বিরোধী মন্তব্য ছাপা হলে এই অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে। 

(3)কোনো সরকারি কর্মচারী বিশেষ অনুমতি ছাড়া সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে পারবেন না।


>> ফলাফল: সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন জারি হলে 'সোমপ্রকাশ', 'সহচর' প্রভৃতি বহু জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই কালাকানুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শিশিরকুমার ঘোষ সম্পাদিত 'অমৃতবাজার পত্রিকা' শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ হতে থাকে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের এই প্রয়াসকে অনেকে শ্বাসরোধকারী আইন বলে নিন্দা করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড রিপন এই আইনটি প্রত্যাহার করে নেন (২৮ জানুয়ারি)।


12. সমাজ সংস্কারে রামমোহনের ভূমিকা উল্লেখ করো । উডের ডেসপ্যাচ কী ?

উত্তর : রামমোহনের সমাজসংস্কার :


রামমোহন ছিলেন ভারতের সর্বপ্রথম আধুনিক মানুষ যিনি চেতনার চাবুক হাতে নিয়ে পচাগলা এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।


(1) সমাজসংস্কারের অঙ্গ হিসেবে রামমোহন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক রামমোহনের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহ নিবারণ আইন জারি করেন।


(2) সে যুগে বিদেশযাত্রা ছিল সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। তিনি নিজে বিদেশ যাত্রা করে এর বিরোধিতা করেন। 

(3) তিনি বহু প্রবন্ধে কন্যাপণ, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের সমালোচনা করেন। 

(iv) তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।


উডের ডেসপ্যাচ :

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড় ভারতে শিক্ষাবিস্তার সম্পর্কে এক নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এটিই উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) নামে খ্যাত। উডের ডেসপ্যাচে সুপারিশগুলি ছিল এরকম


(1) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার, স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন ;

(2) সাধারণভাবে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান এবং উচ্চ ইংরেজি শিক্ষণীয় বিষয়রূপে গুরুত্বান


(3) কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা

(4) বিদ্যালয়গুলিকে সরকারি সাহায্য বা অনুদান দেওয়া


(5) শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যাপারে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (Inspection)-এর নির্দেশ এই নির্দেশনামা অনুসারে একটি শিক্ষা বিভাগ (Department of Public Instruction) গঠিত হয় এবং কলকাতা, মাম্রাজ ও বোম্বাইতে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।


13. ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার কী প্রভাব ছিল? বিধবা বিবাহ প্রচলনের কাজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা লেখ।

উত্তর: ভারতে পাশ্চাত্য-শিক্ষার প্রভাব:

পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের জনজীবনে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন। এর ফলে

(1.) পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসী মধ্যযুগীয় কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্ত হয়।

 (2) পশ্চিমি দেশগুলির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ ভারতীয়দের মানসিক প্রসারতা ঘটায়।

(3) পাশ্চাত্য-শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একদল মানুষ ধর্ম ও সমাজসংস্কারের কাজে উদ্বুদ্ধ হন।

 (4) যুক্তিবাদ ও উদারতাবাদের বিকাশ ভারতবাসীকে রুমে জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হতে প্রেরণা দেয়। তবে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ত্রুটিহীন ছিল না। ইংরেজি শিক্ষা কেবল শহুরে অভিজাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।


বিধবাবিবাহ প্রচলনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা :


নারীমুক্তি আন্দোলনের কাজে বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের যোগ্য উত্তরসাধক। হিন্দুবিধবাদের দুঃখদুর্দশা তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে। বিধবাদের মুক্তির জন্য বিভিন্ন শাস্ত্র বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত।

(1) পরাশর সংহিতা-র একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে, “স্বামী নিরুদ্দেশ হলে, মারা গেলে, ক্লীব প্রমাণিত হলে, সংসারধর্ম ত্যাগ করলে কিংবা পতিত হলে তাঁর স্ত্রী পুনর্বিবাহ করার অধিকারী।"

(2) বিদ্যাসাগর প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন (৭ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ খ্রি.)। পার ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন আর পাত্রী ছিলেন বর্ধমানের পালানাডাঙার ব্রহ্মানন্দ মুখার্জির দশ বছর বয়সি বিধবা কালীমতী দেবী।


(3)) তিনি নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সাথে আঠারো বছরের এক বিধবা ভবসুন্দরীর বিবাহ দেন।


(4) তিনি এগারো বছরের মধ্যে (১৮৫৬-৬৭) মোট ৬০ জন বিধবার বিয়ে দিয়েছিলেন। এজন্য তাঁর খরচ হয়েছিল ৮২ হাজার টাকা।


> ফলাফল: ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিধবাবিবাহ ‘আইনসিদ্ধ’ বলে ঘোষিত হয়। গোঁড়া ও রক্ষণশীল সমাজের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে বিদ্যাসাগর যেভাবে একক প্রচেষ্টায় বিধবাদের বিবাহের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা ভারতীয় হিন্দুসমাজের নারীদের জীবনের এক বিশেষ মোড় বলা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনই প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন।" বিদ্যাসাগর নিজে তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্রকে এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, “বিধবাবিবাহ প্রথা প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম।”


14. সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর :  সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগরের অবদান শতকের আর-একজন অসাধারণ পণ্ডিত ও সংস্কারক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ ৯১ খ্রি.)। মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক দরিত ব্রা পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। প্রখ্যাত কবি মাইকেল মধুসুদন লিখেছেন, বিদ্যাসাগরের মধ্যে ছিল সন্ন্যাসীর প্রজ্ঞা, ইংরেজের উদ্যম এবং বাঙ্গালী-মায়ের কোমল হৃদয় ("Vidyasagar had the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengalee mother)!


বিধবাবিবাহ আইন: নারীমুক্তি আন্দোলনের কাজে বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের যোগ্য উত্তরসাধক। হিন্দুবিধবাদের দুঃখদুর্দশা তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে। বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আমরণ সংগ্রাম চালিয়ে যান। বিভিন্ন শাস্ত্র বিশ্লেষণ করে তিনি প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। পরাশর সংহিতার একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে, স্বামী নিরুদ্দেশ হলে, মারা গেলে, ক্লীব প্রমাণিত হলে, সাথে করলে কিংবা পতিত হলে তাঁর স্ত্রী পুনর্বিবাহ করার অধিকারী।" তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে রক্ষণশীল সমাজপতিরা নানাভাবে বিদ্যাসাগরকে লাঞ্ছিত কিন্তু জীবন বিপ করেও তিনি এই আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাাই XV রেগুলেশন দ্বারা বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়। তার উদ্যোগে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ৬০টি হি অনুষ্ঠিত হয়। 


বাল্যবিবাহের বিরোধিতাঃ বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্ম বা হিন্দুশাস্ত্রে বাল্যবিবাহের কোনো বিধান নেই। 'সর্বশূভকরী' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (১৮৫ খ্র.) তিনি 'বাল্যবিবাহের দোষ" নামক একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই লেখায় তিনি হিন্দু বাল্যবিবাদের অসহায়তা, দুঃসহ যন্ত্রনা, দ্য জীবনের মর্মব্যাথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি বাল্যবিবাহের বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন এবং সভাসমিতিতে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে সরকার একটি আইন পাস করে মেয়েদের বিবাহের বয়স কমপক্ষে ১০ বছর করে।


(1) বহুবিবাহের বিরোধিতা। সে সময়ে হিন্দু সমাজের বুকে বহুবিবাহ প্রথা আলাদল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। বিদ্যাসাগর আগাগোড়া বহুবিবাহের বিরোধিতা করে গেছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রায় ৫০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসহ এক প্রতিবাদপত্র পাঠান ব্রিটিশ সরকার কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ ব্যাপারে সরকারি ভরকে সেসময়ে কোনো সাড়া মেলেনি। কিন্তু বিদ্যাসাগর থেমে থাকেননি। তিনি বহুবিবাহের বিরোধিতা করে আরও দুটি পুস্তক রচনা করেন (১৮৭১ খ্রি.)।


(2) কুলীন প্রথার বিরোধিতা : সে সময় কুলীন ব্রাণেরা অজস্র বিবাহ করতেন, এমনকি বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বহু কুলীন ব্রায়ণ কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাদের কন্যাদায় থেকে মুক্তি দেওয়ার অছিলায় তাদের নাতনির বয়সি মেয়েদের বিবাহ করবেন। এই ভঙানি বন্ধ করার জন্য বিদ্যাসাগর কুলীন বিরুদ্ধে সরব হন।


> অন্যান্য সমাজসংস্কার: বিদ্যাসাগরের অন্যান্য সমাজসংস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—


(1) তিনি মদ্যপানের বিরুদ্ধেও সম্ভব হন।


(2)এ ছাড়া সহবাস সম্মতি' আইনের জন্যও তাঁর অবদান ছিল। 

(3) গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রথা ও কুষ্ঠরোগী হত্যার বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন।

(4) জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা প্রথার তিনি তীব্র নিন্দা করেন এবং এর বিরুদ্ধে তিনি সকলকে সরব হওয়ার আবেদন জানান।


> মূল্যায়ন: স্বামী বিবেকানন বলেছিলেন, রামকৃষ্ণদেবের পর আমি বিন্যাসরকে অনুসরণ AfterRamakrishna, I follow Vidyasagar) |বিদ্যাসাগরের চরিত্র ছিল কুসুনের মতো কোমল, মবার বলের মতোই কঠোর। ন্যায় ও সত্যের প্রতি তিনি যতটা অনুষ্যত ছিলেন, ঠিক ততটাই প্রতিবাদী ছিলেন চনায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। তাই গবেষক বিনয় ঘোষ লিখেছেন, "রামমোহনের মত আদর্শদী (Idealist) কুরমোহনের মত চরমপন্থী (extremist) কোনটাই বিদার ছিলেন না। সমকালীন সময়ে তিনি ছিলেন সত্যকার বাস্তববাদী (realist)। আদর্শবাদের সাথে বাস্তববাদের যে সমন্বয় তাঁর চরিত্রেই তেমনি আর কারো চরিত্রে ঘটেনি।
















সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২

এপ্রিল ১১, ২০২২

দশম শ্রেণির ইতিহাস- জাতীয় আন্দোলনের প্রথম যুগ (The first era of the national movement in Bengali Class-10)

The first era of the national movement
The first era of the national movement

  

                   জাতীয় আন্দোলনের প্রথম যুগ 


1. জাতীয় কংগ্রেসের আদিপর্ব নরমপন্থীদের অবদান কী ?

উত্তর : আদিপর্বে কংগ্রেসের নরমপন্থীদের অবদান :

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের আদিপর্বের নেতারা নরমপন্থী নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁদের অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

>> জাতীয় চেতনার সঞ্চার: নরমপন্থীদের নেতৃত্বেই কংগ্রেস নানা ভাষা ও জাতি অধ্যুষিত জাতীয় বাসীর মধ্যে ব্রিটিশ অপশাসনের স্বরূপ উদ্ঘাটন করে জাতীয় চেতনা সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

 জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা: জাতীয় কংগ্রেস জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় চেতনাকে সুদৃঢ় করে। | বিভিন্ন শহরে কংগ্রেসের অধিবেশনগুলি অনুষ্ঠিত হওয়ায় জাতীয় সংহতি নিবিড় হয়।

> আবেদন-নিবেদন নীতি: জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম যুগের কর্মসূচি আবেদন-নিবেদন নীতির মধ্যেই সীমাবন্ধ ছিল। এ সময়কার কংগ্রেসের নেতৃবর্গ সরাসরি ব্রিটিশের সঙ্গে সংঘর্ষের রাস্তায় না গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভুলত্রুটিগুলি জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

 >> সরকারের সমালোচনা: জাতীয় কংগ্রেস ক্রমাগত সরকারি কাজের সমালোচনা করে। এর ফলে ভারতবাসী ব্রিটিশ সরকারের প্রকৃত স্বরূপটি বুঝতে পারে।

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথমযুগের কর্মপ্রচেষ্টাকে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সমালোচনা করেছেন। অশ্বিনী দষ্ট এসময়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনগুলিকে 'তিনদিনের তামাশা' বলে বাচ্চা করেছেন। লালা লাজপত রায়ের মতে-নরমপন্থীরা চেয়েছিলেন রুটি, পেয়েছিলেন পাথর। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র লিখেছেন, ১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময় ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ বপনের কাল এবং মহিপর্বের নেতারাই সেই কাজ যথার্থভাবে সম্পন্ন করেছিলেন।


2. জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন সম্পর্কে যা জানো লেখ।

উত্তর : জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন :

পটভূমি: বঙ্গভঙ্গের  বিরুদ্ধে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের লক্ষ্য ও পরি কংগ্রেসের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। চরমপন্থী সদস্যরা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন তীব্রতর করে সরকারকে অচল করে দেওয়ার দাবি তোলেন, কিন্তু নরমপন্থীরা কোনোরকম জঙ্গি আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের কলকাতা কংগ্রেসে চরমপন্থীরা চাপ সৃষ্টি করে চারটি প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেন, যথা স্বদেশি জাতীয় শিক্ষা। তাদের ভয় ছিল পরবর্তী সুরাট অধিবেশনে নরমপন্থীরা এই প্রস্তাবগুলি নাকচ করে নেবেন। তাই চরমপন্থীরা ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেসের  মঞ্চ দখল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলে বিরোধ চরমে পৌঁছোয়।


সুরাট ভাঙন: সুরাট অধিবেশনে চরমপন্থীরা লালা লাজপত রায়কে সভাপতি করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তিনি এই পদ গ্রহণে রাজি না হলে চরমপন্থীরা তিলককে সভাপতি করার দাবি তোলেন। নরমপন্থীরা বিচক্ষণতার সঙ্গে মধ্যপন্থী নেতা রাসবিহারী ঘোষকে সভাপতি মনোনীত করেন। এতে দুই দলের মধ্যে বিবাদ চরম আকার নেয় এবং তাদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়। ফলস্বরূপ চর কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হন। নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের এই ভাঙন সুরাট ভাঙন (Surat split) নামে পরিচিত।


 তাৎপর্য: বড়োলাট লর্ড মিন্টো সুরাট ভাঙনকে কার্যত সরকারের বিজয় বলে পূর্ব প্রকাশ করেন। বস্তুতই নরমপন্থীরা ইংরেজ সরকারের ওপর আস্থা রেখেই সুরাটে এত কঠোর ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই ঘটনা জাতীয় কংগ্রেসের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। অবশ্য অল্পকালের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ পুনরায়  সংঘবদ্ধ হয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, সুরাটের ঘটনার ফলে জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ও নতুন এক যুগের সূচনা ঘটে।


3. লর্ড কার্জন কেন বাংলা ভাগ করেছিলেন ?

উত্তর : লর্ড কার্জনের বাংলা ভাগ :

> বঙ্গভঙ্গ: ভাইসরয় লর্ড কার্জনের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষিত হয় এবং ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর 'বঙ্গভঙ্গ' কার্যকর হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গভঙ্গগকে 'জাতীয় বিপর্যয়' বলে অভিহিত করেছেন।

কার্জনের যুক্তি: কার্জনের বাংলা ভাগের পিছনে যুক্তি হল—

প্রথমত, অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের আয়তন খুব বড়ো। একজন গভর্নরের পক্ষে এতবড়ো প্রদেশের শাসনভার বহন করা কষ্টকর।

দ্বিতীয়ত, কলকাতা থেকে সুদুর পূর্ববাংলাকে ভালোভাবে শাসন করা সম্ভব নয়।

 • তৃতীয়ত, আসামের চা বাগানের মালিকরা চা, তেল প্রভৃতি কম খরচে রপ্তানির জন্য আসামের সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযুক্তি চাইছেন। তাদের স্বার্থে বলাভঙ্গের প্রয়োজন।

চতুর্থত, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামকে যুক্ত করা হলে আসামে সুদক্ষ প্রশাসন গড়ে উঠবে।


পঞ্চমত, উড়িষ্যার সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের জন্য বাংলা ভাগের প্রয়োজন।


> প্রকৃত উদ্দেশ্য: বাংলা ভাগের পিছনে কার্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। যেমন—


(1) ভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যমণি বাংলাকে বিভক্ত করে তার শক্তিকে খর্ব করা। 

(2) বাংলাকে বিভক্ত করে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা।


(3) আসামের চা বাগানের মালিকদের স্বার্থরক্ষা করা।


(4) ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ঘাঁটি কলকাতাকে তার স্বর্ণাসন থেকে নামিয়ে দেওয়া।


4. বাঘাযতীন স্মরণীয় কেন ?

উত্তর : বাঘা যতীন ও বুড়িবালামের যুদ্ধ :

রাসবিহারী বসুর দেশত্যাগের পর বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (যতীন)। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট বাংলার বিপ্লবীরা কলকাতার অস্ত্র ব্যবসায়ী রডা অ্যান্ড কোম্পানির আমদানি করা ৫০টি | মাউজার পিণ্ডল ও ৪৬ হাজার কার্তুজ লুঠ করেছিল। যতীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে আরও অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালান। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাভেরিক, হেনবিএস এবং এ্যানিলারসন নামক তিনটি মহাজে অস্ত্র আনানোর ব্যবস্থা হয়। স্থির হয়, মাভেরিক জাহাজ থেকে গোপনে অস্ত্র নামানো হবে উড়িষ্যার বালেশ্বরে। বাঘা যতীন তাঁর দলবল নিয়ে বালেশ্বর যান।

ইতিমধ্যে জার্মানি থেকে পাঠানো কিছু অর্থ বালেশ্বরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়ে এবং সমস্ত তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ফলে ব্রিটিশরা জাহাজ তিনটি বাজেয়াপ্ত করে। বালেশ্বরে পুলিশ বাঘা যতীনের সনে অগ্রসর হয়। বুড়িবালামের তীরে বাঘা যতীন ও তাঁর সহকর্মীরা পুলিশবাহিনীর মুখোমুখি হন। বাঘা যতীন যুদ্ধে সাংঘাতিকভাবে আহত হন। পরে শহিদের মৃত্যু বরণ করেন (১০ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫ খ্রি.)। বাঘা যতীন ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব লাভ করেন।

বুড়িবালামের যুদ্ধে বিপ্লবীদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ ভারতবাসীকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্রের মতে, বুড়িবালামের যুদ্ধ বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা।


5. ভারতের জাতীয় আন্দোলনে বালগঙ্গাধর তিলকের অবদান কী ছিল ?

উত্তর : বালগঙ্গাধর তিলক :

ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন বালগাধর তিলক (১৮৫৬-১৯২০)। তিনি সক্রিয় আন্দোলনের মাধ্যমে আত্মশক্তি দ্বারা স্বরাজ অর্জনের ডাক দেন।

পত্রিকা সম্পাদনা: তিনি মারাঠা' এবং 'কেশরী' নামে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দুটি পত্রিকাই নিরন্তর ব্রিটিশ বিরোধী প্রবন্ধ ও আলোচনা প্রকাশ করে জাতীয়তাবোধে দেশবাসীকে উদবুদ্ধ করেছিল।


গণপতি ও শিবাজী উৎসব :জনগণের মনে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটাতে তিলক গণপতি উৎসব ও শিবাজী উৎসব-কে গণ-উৎসবে পরিণত করেন। স্বদেশি বক্তৃতা, গান, শোভাযাত্রা প্রভৃতির মাধ্যমে এই উৎসব জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশ-চেতনা বৃদ্ধি করে।


>  বয়কট আন্দোলনে নেতৃত্ব : তিলকের নেতৃত্বে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন মহারাষ্ট্রে প্রসারলাভ করে। তিলক ঘোষণা করেন বয়কট ও নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আমাদের অস্ত্র। কারো ওপর বলপ্রয়োগের পক্ষপাতী আমরা নই। কর্মপন্থা অনুসরণ করতে গিয়ে যদি দুঃখবরণ করতে হয় তা হলেও আমরা পিছু হঠব না।


> হোমরুল আন্দোলন: হোমরুল আন্দোলনের মাধ্যমে তিলক রাজ অর্জনের চেষ্টা করেন। তাঁর আহ্বানে বহু যুবক হোমরুল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিলক হোমরুল লিগের মাধ্যমে গণ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি অত্যন্ত দ্রুত এই আন্দোলনকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িে তিলক বলেন—দমন পীড়ন বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে সাহায্য করবে। হোমবুল এখন ছড়িয়ে দাবানলের মতো। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার এবং আমি তা অর্জন কর (("Swaraj is my birth-right and I must have it")। হোমরুল আন্দোলন ে নেতায় পরিণত করে। তিলক 'লোকমান্য' অভিধায় ভূষিত হন। তিলকের আদর্শ, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ দেশবাসীকে সক্রিয় আন্দোলনে উল্লখ সম্পর্কে অরবিন্দ ঘোষ লিখেছেন তিলকই জাতীয় আন্দোলনকে জনতার কাছে পৌঁছে দেন।


6. বিপ্লবী লালা লাজপত রায় সম্পর্কে কী জানা যায় ?

উত্তর : লালা লাজপত রায়:

(1) লালা লাজপত রায় (১৮৬৫-১৯২৮ খ্রি.) ছিলেন সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা। 'লাল-বাল-পাল'-এর অন্যতম সদস্য। প্রথম জীবনে তিনি আর্যসমাজের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে তিনি এলাহাবাদের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে (১৮৮৮ খ্রি.) যোগ দেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তিনি নেতারূপে তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করেন।

(2) তাঁর নেতৃত্বে চরমপন্থী আন্দোলন পাঞ্জাবে ব্যাপকতা পায়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের শোষণমূলক ভূমি-রাজস্ব আইনের বিরুদ্ধে এবং অতিরিক্ত জলকরের বিরুদ্ধে তিনি কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এজন্য তাঁকে মান্দালয় জেলে বন্দি করা হয়।

(3) 'কায়স্থ সমাচার' পত্রিকায় তিনি নরমপন্থী রাজনীতির অসারতা তুলে ধরেন। পাঞ্জাবি ভাষায় তিনি ‘পাঞ্জাবি' পত্রিকা প্রকাশ করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন।

(4) অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। দেশপ্রেম ও সাহসিকতার জন্য জনগণ তাঁকে শের-ই-পাঞ্চাব (পাঞ্জাব কেশরী) অভিধায় ভূষিত করে।

 

7. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব কী ছিল ?

উত্তর :ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব


ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 

(1) বিপ্লবীদের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মবলিদানের দৃষ্টান্ত সমগ্র দেশবাসীর মনে প্রেরণা সঞ্চার করেছিল।

(2) ভারতবাসীর মনে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস জাগাতে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী যুবকদের আত্মত্যাগের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য।


(3) যুবসমাজের আত্মোৎসর্গ দেশের জাতীয় নেতাদের সংগ্রামমুখী কর্মসূচি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।বিপ্লববাদী আন্দোলন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে একধাপ এগিয়ে দেয়।

(4) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন এই শিক্ষা দেয় যে—ভারতবাসী যে-কোনো মূল্যে স্বাধীনতা পেতে মরিয়া। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতে—তাঁরা আবার আমাদের মনুষ্যত্বের গর্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

 (5) এই আন্দোলন ভারতবাসীকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকার পরিবর্তে আত্ম বিসর্জনের মাধ্যমে হলেও স্বাধীনতা অর্জন প্রয়োজন।


(6) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ভারতের জাতীয় সংগ্রামের মূল ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। বিপ্লবীরা এই আন্দোলন থেকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন।

তাই ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, গান্ধিজি পরিচালিত অহিংস আন্দোলন এবং বিপ্লবী আন্দোলন ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের দুটি ধারা। এরা ছিল পরস্পরের পরিপূরক।


8. স্বদেশী ও স্বরাজ বলতে কী বোঝো ?

উত্তর : লর্ড কার্জন অন্যায়ভাবে বাংলাকে ভাগ করতে চাইলে সারা বাংলা প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। শুরু হয় বলাভলা-বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫ খ্রি.)। এই আন্দোলনে স্বদেশি ও স্বরাজ—এই দুটি গঠনমূলক আদর্শকে ভিত্তি করে জাতীয়তাবোধ সম্প্রসারিত হয়।

স্বদেশি :

'স্বদেশি' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল দেশীয়। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় স্বদেশি' কথাটি বহুল প্রচারিত হয়।

(1) ব্রিটিশ সরকারের বলাভলোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হিসেবে দেশে ছি আন্দোলনের জোয়ার আসে।

(2) অবশ্য 'স্বদেশি' আদর্শ ও চেতনা আমাদের দেশে আগে থেকেই ছিল। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্ে স্বদেশির কথা পুনাতে প্রথম বলেন গোপালহরি দেশমুখ। কলকাতায় মুখার্জিস মাথারিন এ ভোলানাথ চন্দ্র একাধিক প্রবন্ধ রচনা করে স্বদেশি আদর্শকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

 (3) ''স্বদেশী হল দেশের ঐতিহ্য ও জীবনধারার প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা।

(4) স্বদেশি সম্পর্কে লালা লাজপত রায় বলেন যে, স্বদেশি মানে দেশের মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশি অর্জনের জন্য আত্মশক্তি বিকাশের ওপর জোর দেন।

স্বরাজ :

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় স্বরাজ' কথাটিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

 (1) জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে (১৯০৬ খ্রি.) সভাপতির ভাষণে দাদাভাই নওরোজি জাতীয় আন্দোলনের লক্ষ্য হিসেবে 'স্বরাজ' অর্জনের কথা বলেন।

 (2) পরবর্তীকালে নরমপন্থী ও চরমপন্থী নেতারা নিজ নিজ আদর্শ অনুযায়ী রাজশ ব্যাখ্যা করেন। নরমপন্থী নেতাদের কেউ কেউ স্বরাজ বলতে ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে থেকে স্বাধিকার অর্জনের কথা বলেন। প্রখ্যাত বিপ্লবী সখারাম গণেশ দেউস্কর (১৮৬৯-১৯১২ খ্রি.) ‘স্বরাজ' শব্দটি স্বাধীনতার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন। বিপিনচন্দ্র পালের ভাষায় স্বরা হল, ব্রিটিশ শাসনমুক্ত আত্মকর্তৃত্ব।

(3) বালগাধর তিলক বলেন, 'স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার। তবে তিলকের কাছে স্বরাজ' এর অর্থ ছিল শাসনব্যবস্থার ওপর ভারতীয় নিয়গুণ স্থাপন। 

(4) আবার অরবিন্দ ঘোষের বিচারে স্বরাজ ছিল 'নৈতিক' ও 'আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ। জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রথমে 'স্বরাজ' বলতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বোঝানো হয়।পরবর্তীকালে 'স্বরাজ' অর্থে 'স্বাধীনতাকে বোঝানো হয়।


9. জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কাল থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেসের কার্যকলাপ সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: ১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ খ্রি. পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের কার্যাবলি :

প্রতিষ্ঠালাভের পরবর্তী কুড়ি বছর (১৮৮৫-১৯০৫ খ্রি.) জাতীয় কংগ্রেসের আদিপর্ব নামে পরিচিত। এই পর্বের নেতৃবৃন্দ সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরূপ গণ আন্দোলন সংগঠিত করার পরিবর্তে 'আবেদন-নিবেদন' মাধ্যমে সরকারের সহানুভূতি অর্জনে আস্থাশীল ছিলেন। এই কারণে প্রথম পর্বের নেতাদের নরমপন্থী (Moderate) নামে অভিহিত করা হয়। কংগ্রেসের আদিপর্বের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দাদাভাই নওরোজি , বদরুদ্দিন তায়েবজী, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ যন্দ্যাপাধ্যায়, ফিরোজ শাহ মেহতা, আনন্দ চারলু প্রমুখ। ড. রমেশচন্দ্র জুমদারের মত অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভারতবাসীর স্বার্থের প্রহরী ("The Indian National Congress guarded the interests of India like a vigilant watchdog") i


আবেদন-নিবেদন নীতি: প্রথম পর্বের কংগ্রেস নেতাদের এয় সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও পাশ্চাত্য মনোভাবাপন্ন। ইংরেজ-জাতির উরতা ও ন্যায়বোধের ওপর এঁদের গভীর আস্থা ছিল। ধর্ম ও সমাজ সম্বোরের মতোই রাজনীতির ক্ষেত্রেও নরমপন্থীরা ছিলেন অতিসতর্ক শঙ্কারপন্থী। দাদাভাই নওরোজি বলেছিলেন—সদা ব্যস্ত ব্রিটিশ-জাতির কাছে আমরা যদি বলিষ্ঠ কণ্ঠে এবং বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারি, তবে তা অবশ্যই বিফলে যাবে না।


>> লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য  : প্রথম পর্বের নেতৃবৃন্দ সাংবিধানিক পথে ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভারতবাসীর দাবি আদায়ের জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালান। কংগ্রেসের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল—(1)  জাতিধর্ম নির্বিশেষে ও গণতান্ত্রিক পথে একটি জাতীয় আন্দোলন সংগঠিত করা; (2)ভারতবাসীকে রাজনৈতিকভাবে হন করা; (3) সর্বভারতীয় স্তরে নেতৃত্ব দান এবং (4) ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রচার করা।

এজন্য প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক সম্মেলন আহ্বান করে প্রস্তাব গ্রহণ করা হত। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে–কংগ্রেস ভারতবাসীর ঐকা ও ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্ব চায়।


> দাবি: প্রথম কুড়ি বছরে কংগ্রেসের দাবিগুলিকে চারভাগে ভাগ করা যায়-রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক।


● রাজনৈতিক দাবি:


(1) রাজনৈতিক দাবির মূল লক্ষ্য ছিল বেশিসংখ্যক ভারতীয়কে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। 

(2) প্রথম অধিবেশনেই কংগ্রেস ভারত-সচিবের দপ্তর বিলোপের দাবি জানায়। ভারত-বিে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ওই দপ্তরের বদলে কমল সভায় একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। 

(3) প্রতি প্রদেশ থেকে অন্তত দুজন করে ভারতীয়কে কমন্স সভায় মনোনয়নের দাবি জানানো হয়।

 (4) ব্যবস্থাপক সভায় (Legislative Council) নির্বাচিত প্রতিনিধি বাড়ানোর দাবি করা হয়। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় কাউন্সিল আইন প্রণয়ন করে।


প্রশাসনিক দাবি:


(1) প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে জাতীয় কংগ্রেস উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগ দাবি করে। এই ব্যবস্থা দ্বারা বিদেশে অর্থের বহির্গমন আটকানো এবং দেশের সেবায় দেশীয় মানুষের বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হয়।


(2)নরমপন্থী নেতারা সংবাদপত্র ও বাতৃস্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হন। 

(3) শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ, জুরিব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার আইন বাতিল ইত্যাদি দাবিও তোলা হয়।


(4) ভারতীয়দের সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা ও উচ্চপদে নিয়োগের দাবি জানানো হয়।


অর্থনৈতিক দাবি:


(1) জাতীয় কংগ্রেস বার্ষিক অধিবেশনগুলিতে অর্থসংস্কারের ওপর জোর দেয়।


( 2)ভারত থেকে সম্পদের অবাধ বহির্গমন বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।


(3) ভারতের আর্থিক উন্নতির জন্য কংগ্রেস আধুনিক শিল্প-প্রতিষ্ঠার দাবি করে।


(4) শুরনীতি গ্রহণ করে শিল্পের বিকাশ ঘটানোর দাবি জানানো হয়।


(5) কৃষকের ওপর থেকে রাজস্বের ভার কমানোর দাবি করা হয়।


(6) চা-শ্রমিকদের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি, লবণ করের বিলোপ ইত্যাদি দাবিও কংগ্রেস উত্থাপন করে।


(7) অরণ্য সংরক্ষণ ও আধিবাসীদের ক্ষেত্রে অরণ্য আইন সরল করার দাবি জানানো হয়। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবি: জাতীয় আন্দোলনের আধিপর্বের নেতারা অধিকার, বাক্ স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও সংগ্রাম করেন।


ব্যর্থতা: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কুড়ি বছরে কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে কারেন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সামগ্রিক বিচারে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের কার্যকলাপকে বখই বলা যায়। তবে এই ব্যর্থতার জন্য মূলত দায়ী ছিল ব্রিটিশ-জাতির অনমনীয় মনোভাব ও অসহযোগিতা। নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদন নীতিকে ইংরেজ সরকার কোনো মূল্য দেয়নি। তাই সমপন্থীর নরমপন্থীদের নীতিকে রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি বলে বাল্লা করেন। আসলে তখন কংগ্রেসের খণভিত্তি হতে ছিল না। তাই ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ আন্দোলন সংগঠিত করা সম্ভব ছিল না।

মূল্যায়ন: আপাত ব্যর্থ হলেও জাতীয় কংগ্রেসকে ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে নরমপন্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র লিখেছেন— ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময় ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ বপনের কাল এবং আদিপর্বের নেতারাই সেই কাজ যথার্থভাবে সম্পন্ন করেছিলেন ("The period from 1885-1905 was the seed time of Indian nationalism and the earliest nationalists sowed the seeds well and deep")






রবিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২২

এপ্রিল ১০, ২০২২

নবম শ্রেণীর ইতিহাস- জাতিসংঘ এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (The League of Nations and The United Nations Organisation in bengali Class-9)

  

              জাতিসংঘ এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ

United Nations
United Nations 


1. লিগ পরিষদ কিভাবে গঠিত হয় ?

উত্তর : লিগ পরিষদ গঠিত হয়েছিল ৫ টি স্থায়ী ও ৪ টি অস্থায়ী মোট ৯ টি সদস্য নিয়ে। ইংল্যান্ড ,ফ্রান্স ,ইতালি ,জাপান স্থায়ী সদস্য হিসেবে যোগদান করলেও আমেরিকা যোগ দেয়নি। পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও জার্মানি স্থায়ী সদস্য হিসেবে যোগদান করলে স্থায়ী সদস্য সংখ্যা হয় ৬ এবং অস্থায়ী সদস্য হয় ৯।

2. লন্ডন ঘোষণাপত্র বলতে কী বোঝো?

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে লন্ডন শহরে কানাডা ,নিউজিল্যান্ড ,অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিগণ মিলিত হয়ে একটি ঘোষণাপত্রের দ্বারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব জানান । এই ঘোষণাপত্রই লন্ডন ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত।


3. লন্ডন ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব কী ?

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ইংল্যান্ড ,অস্ট্রেলিয়া ,নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিগণ লন্ডনে এক ঘোষণাপত্রের দ্বারা বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন। অর্থাৎ এই ঘোষণাপত্রকেই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যায়। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম।


4. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদ সদস্য বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: যেসকল রাস্ট্র ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে প্রথম স্বাক্ষর করেছিল, তাদের সনদ সদস্য বলা হয়।১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে ৫১ টি দেশ প্রথম স্বাক্ষর করে। এই ৫১ টি দেশ হলো সনদ সদস্য ভুক্ত দেশ।


5. জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য গুলি কী?

উত্তর: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য গুলি হল-

1. যুদ্ধ মুক্ত করে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা।

2. শান্তিভঙ্গকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং সব সদস্য রাষ্ট্রের দ্বারা প্রত্যেক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শান্তি সুনিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

3. আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়নীতি অনুসরণ করা।

4. বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপনের পথ পরিষ্কার করা।

5. পৃথিবীর মানবজাতির অর্থনৈতিক,সামাজিক প্রভৃতি বিভিন্ন মানবিক সমস্যাবলির সমাধান করা।

6. বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।

7. সকল ধর্মাবলম্বীরা ভাষাভাষীর মানুষকে সম্মান মর্যাদা দান করা।


6. নিরাপত্তা পরিষদ বলতে কী বোঝায়?

উত্তর : নিরাপত্তা পরিষদ হল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিশালী সংস্থা। ৫ টি স্থায়ী ও ৬ টি অস্থায়ী অর্থাৎ মোট ১১ টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ৬ থেকে বাড়িয়ে ১০ করা হয়। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ১৫। অস্থায়ী সদস্যরা ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।


7.   সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নীতি গুলি কী?

উত্তর : সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের ২ নম্বর ধারায় জাতিপুঞ্জের নীতিগুলি লিপিবদ্ধ রয়েছে। নীতিগুলি হল-

1.  জাতিপুঞ্জের সদস্য রাষ্ট্রগুলির সমান সার্বভৌম মর্যাদা।

2. শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান।

3. জাতিপুঞ্জ কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না ইত্যাদি।


8. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান সংস্থা কয়টি ও কী কী?

উত্তর: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান সংস্থা ছয়টি

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান সংস্থাগুলি হল-

1. সাধারণ সভা।

2. নিরাপত্তা পরিষদ।

3. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ।

4. অছি পরিষদ।

5. আন্তর্জাতিক বিচারালয়।

6. মহাসচিব ও সচিবালয়।


9. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা কীভাবে গঠিত হয় ?

উত্তর: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সকল সদস্যকে নিয়ে সাধারণ সভা গঠিত হয়। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ৫১ টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ সভা গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে সাধারণ সভার সদস্য রাষ্ট্র সংখ্যা ১৯৩। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র সাধারণ সভায় ৫ জন করে প্রতিনিধি পাঠাতে পারে। তবে ভোট দেয়ার সময় প্রত্যেক রাষ্ট্র একটিমাত্র ভোট প্রদানের অধিকারী।


10. জাতিপুঞ্জের কোন রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: জাতিপুঞ্জ বা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী জাতিপুঞ্জের নিয়ম কানুন মানতে বদ্ধপরিকর কোন রাষ্ট্র সদস্যপদ গ্রহণের আবেদন জানালে তা নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো হয়- এই পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ সভার ২/৩ অংশ সদস্যের সম্মতিতে আবেদনকারী রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করে। 


11. ভেটো বলতে কী বোঝায় ?

উত্তর: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে কোন প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থায়ী ৫ টি সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন। যে কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র অসম্মতি জানালে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। স্থায়ী সদস্যদের অসম্মতিজ্ঞাপক ভোটে কোন প্রস্তাব বাতিল করার ক্ষমতাকে ভেটো বলে।


12. ডবল ভেটো বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ টি সদস্য রাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। প্রয়োজনে এইসব সদস্য রাষ্ট্র একই বিষয়ে দুবার ভেটো দিতে পারে, একে ডবল ভেটো  বলে।


13. যুগ্ম নিরাপত্তা বলতে কী বোঝো ?

উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তা ও বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য একক প্রচেষ্টার পরিবর্তে মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। এইভাবে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটাই যুগ্ম নিরাপত্তা নামে পরিচিত।


14.  বারুচ প্রকল্প কী ?

উত্তর: ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন কূটনীতিবিদ বার্নার্ড বারুচের নামে একটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা তৈরি হয়, যাতে পারমাণবিক শক্তির বিপজ্জনক ব্যবহারের এবং এই শক্তির বিজ্ঞানসম্মত ও অর্থনৈতিক ব্যবহারের কথা বলা হয়। এই প্রস্তাব জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় গৃহীত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো প্রয়োগ দ্বারা এই প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে বাতিল হয়। এই প্রস্তাবই বারুচ প্রকল্প নামে পরিচিত।


15. নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান কাজ কী?

উত্তর : সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের উপর বহু গুরুত্বপূর্ণ কার্যভার অর্পণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান কাজ হল- 

1. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।

2. আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার জন্য যেকোনো বিষয়ে তদন্ত ,সালিশি ও শাস্তিদান করা।

3. আন্তর্জাতিক শান্তিভঙ্গকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করা।

স্থায়ী সদস্যরা কোন প্রস্তাবে ভেটো প্রয়োগ করে সেটি নাকচ করে দিতে পারে।

5. অভিযোগকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাতে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলি সামরিক অভিযান চালায় ,সে ব্যাপারেও পরামর্শ দিতে পারে নিরাপত্তা পরিষদ।

6. আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই পরিষদ তদন্ত করতে পারে।


16. জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই বিবদমান রাষ্ট্রবিরোধী রাশিয়া ও আমেরিকার পৃথক পৃথক জোট গড়ে ওঠে। ভারতের নেতৃত্বে অনেক রাস্ট্র কোন জোটে যোগ না দিয়ে জোট নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করে। একে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বলে।


17. সুয়েজ সংকট জাতিপুঞ্জের ভূমিকা কী ছিল ?

উত্তর: ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ইংল্যান্ড ,ফ্রান্স ও ইসরায়েল যৌথভাবে মিশর আক্রমণ করে সুয়েজ খালের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয় ।শেষ পর্যন্ত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব দেয় এবং জাতিপুঞ্জের শান্তির সেনা মিশরে প্রবেশ করে ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনে।


18. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতাগুলি লেখ।

উত্তর :  সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতাগুলি হল-

1. এই সংস্থা ভারত পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে।

2. নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে পারেনি।

3. সর্বোপরি, উপসাগরীয় যুদ্ধ ও বর্ণবৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়।


19. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আলোচনা কর।

উত্তর: প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল সংগ্রহ, স্থায়ী নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি রাশিয়া ও আমেরিকার মত বৃহৎ শক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল রূপে প্রতিভাত হয়।


20. জাতিসংঘ কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর: মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘ স্থাপিত হলেও মূলত যেসব কারণে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছিল, সেগুলি হল-

1. জাতিসংঘের সাংগঠনিক দুর্বলতা,

2. তার ত্রুটিপূর্ণ ভোটদান পদ্ধতি,

3. আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের জাতিসংঘের সদস্যপদ গ্রহণ না করা,

4. যুদ্ধকে বেআইনি ঘোষণা করলেও আগ্রাসনকে নিষিদ্ধ না করা,

5. জাতিসংঘের নিজস্ব সেনাবাহিনীর অভাব,

6. ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণনীতি এবং সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা।


21.  জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মধ্যে সাদৃশ্য গুলি আলোচনা করো।

উত্তর: জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মধ্যে সাদৃশ্যগুলি হল-

1. বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পরই দুটি সংগঠন জন্ম নেয়। জাতিসংঘ গঠিত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে এবং জাতিপুঞ্জ গঠিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে।

2. উভয় সংগঠনেরই লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা।

3. উভয় সংস্থারই অঙ্গসমূহের গঠনতন্ত্রে মিল ছিল।

4. উভয় সংস্থাই যুদ্ধের পরিবর্তে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নীতিতে বিশ্বাসী ছিল।

5. জাতিসংঘ ও জাতিপুঞ্জ উভয়েরই সদস্য রাষ্ট্রগণ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে  ভেটো প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা দিতে পারে।

6. জাতিসংঘের ম্যান্ডেট ও জাতিপুঞ্জের অছি ব্যবস্থা প্রায় একই জিনিস।


22. জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মধ্যে বৈসাদৃশ্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মধ্যে বৈসাদৃশ্যগুলি হল-

1. জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যোগ না দেওয়ায় তা প্রথম থেকেই দুর্বল ছিল। কিন্তু সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকে যুক্ত আছে।

2. জাতিসংঘ প্রধানত শান্তি ও নিরাপত্তার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু জাতিপুঞ্জ শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশ্ব মানব সমাজের সংস্কৃতির বিকাশের দিকেও দৃষ্টি রাখে।

3. জাতিসংঘের তুলনায় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান।

4. জাতিসংঘের সাফল্য ভার্সাই চুক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু জাতিপুঞ্জের সাফল্য কোন শক্তির উপর নির্ভরশীল নয়।

5. জাতিসংঘের সদস্য নয় এমন কোন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত না  কিন্তু অসদস্য রাষ্ট্রগুলিকেও  সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ শাস্তিপ্রদান করার অধিকারী।

6. জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলি নিজেদের বিশ্ববাসীর প্রতিনিধিরূপে ভাবতে পারেনি। অন্যদিকে জাতিপুঞ্জের সনদেই বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।


23. পঞ্চশীল চুক্তি কী? এই চুক্তির আদর্শগুলি লেখ। 

উত্তর: ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ -এন -লাই এক শুভেচ্ছা সফরে ভারতে আসেন। এই সফরে তিব্বত সম্পর্কে উভয় দেশের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়। ভারত ও চীন ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ এর কাছে পাঁচটি নীতি অনুসরণ করার অঙ্গীকার করে। সেই পাঁচটি নীতির ভিত্তিতে উভয় দেশ এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এটি পঞ্চশীল চুক্তি নামে পরিচিত।


চুক্তির আদর্শ: পঞ্চশীলের আদর্শ গুলি হল-

1. প্রত্যেক রাষ্ট্রের ভৌগলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন,

2. পরস্পরের বিরুদ্ধে আগ্রাসন থেকে বিরত থাকা।

3. অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা,

4. পারস্পরিক মর্যাদা জ্ঞাপন

5. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

এই পঞ্চশীল নীতি কেবল ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের ভিত্তিও এই পাঁচটি নীতি। পৃথিবীর বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক এই পাঁচটি নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে পারলে পৃথিবীর শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হবে বলেন নেহেরু মনে করতেন।


24.  বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি সংক্ষেপে লেখ।

উত্তর: ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ থেকে ২৬ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহরে একটি সম্মেলন আহূত হয়। এখানে এশিয়া ও আফ্রিকার মোট ২৬ টি দেশ মিলিত হয়। জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ভারত এই সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা করে।

বিভিন্ন প্রস্তাব : বান্দুং সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব গুলি হল-

1.  মৌলিক মানবাধিকার ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের প্রতি মর্যাদা দেখাতে হবে।

2. প্রতিটি রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

3. বর্ণগত ও জাতিগত বৈষম্যে স্বীকার করা হবে না।

4. আগ্রাসনমূলক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে।

5. কোন বৃহৎ শক্তি আগ্রাসনে শামিল হওয়ার জন্য চাপ দিলেও মাথা নত করা হবে না।

6. সব জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা হবে।

7. সমস্ত বিরোধ ও মতভেদ শান্তিপূর্ণ পথে পারস্পরিক আলাপ আলোচনা বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হবে।

8. প্রতিদিনের ন্যায় নীতি ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের দায়বদ্ধতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।


25. আটলান্টিক চার্টারের গুরুত্ব কী ছিল?

আটলান্টিক চার্টারের গুরুত্ব : আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গড়ে তোলার পেছনে আটলান্টিক চার্টারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। জাতিপুঞ্জের সনদের বিভিন্ন ধারায় আটলান্টিক চার্টারের ধারণাগুলির প্রভাব স্পষ্ট। সুস্থ, সুন্দর মানবজাতির গড়ে তোলার অঙ্গীকার এর মধ্যে দিয়ে আটলান্টিক চার্টার নবযুগের সম্ভাবনা সূচিত করে। কিন্তু অদ্যাবধি আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খবরদারি বিশ্ব শান্তি বিঘ্নিত করেছে। আটলান্টিক চার্টারে প্রত্যেকটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও ভারতসহ এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশের ক্ষেত্রে এই নীতি প্রযুক্ত  হয়নি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রকে সমান অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা প্রদানের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে অনুন্নত দেশগুলোকে প্রয়োজনমতো অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়নি। এই কারণে বিশ্ব ধনশালী, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত এই তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। সর্বোপরি একথা অনস্বীকার্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এখনো পর্যন্ত বিশ্ব যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা যায়নি।





















শুক্রবার, ৮ এপ্রিল, ২০২২

এপ্রিল ০৮, ২০২২

ভারতের সুলতানি ও মোগল যুগের ইতিবৃত্ত ( History of the sultanate and Mughal Era in India in Bengali)

 

               ভারতের সুলতানি                      ও মোগল যুগের ইতিবৃত্ত

History of sultanate and Mughal Era
History of sultanate and Mughal Era


1.  নব মুসলমান কাদের বলা হয়?

উত্তর: ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল বাহিনী ভারত আক্রমণ করলে সুলতান জালালউদ্দিন খলজি তাদের পরাজিত করেন। এই সময়  হলাগুর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মোঙ্গল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ভারতে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সুলতানের অনুমতি অনুসারে দিল্লির উপকণ্ঠে বসবাসকারী এই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মোঙ্গলরা নব মুসলমান নামে পরিচিত হয়।


2. আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতির উদ্দেশ্য কী ছিল ?

উত্তর: আলাউদ্দিন খলজি স্বল্প ও নির্দিষ্ট বেতনে বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনীর ব্যয়নির্বাহের জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি না হওয়ায় সৈন্যরা একই বেতনে বছরের পর বছর কাজ করত।


3. মনসবদারি প্রথা কী ?

উত্তর: 'মনসব ' কথাটির আক্ষরিক অর্থ 'পদমর্যাদা'। কুরেশির মতে কার্যকরী অর্থে মনসব এমন একটি পদ ছিল যার সঙ্গে বেশ কিছু নিয়ম ও দায়িত্ব সংযুক্ত হয়। আকবরের আমলে বিশেষ পদমর্যাদাযুক্ত ও দায়িত্বপূর্ণ কর্মচারী নিয়োগের যে প্রথা চালু হয় তাই মনসবদারি প্রথা নামে পরিচিত।


4. নুরজাহান ইতিহাসে বিখ্যাত কেন ?

উত্তর: নুরজাহান ছিলেন জাহাঙ্গীরের পত্নী। তিনি ছিলেন রূপবতী, বুদ্ধিমতী এবং  উচ্চাভিলাষীণী। তিনি জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার করায়ত্ত করে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে 'নুরজাহান চক্র' গড়ে তুলেছিলেন।


5. আরব মুসলমানদের সিন্ধু আক্রমণ সম্বন্ধে লেখ।

উত্তর : আরব মুসলমানদের সিন্ধু জয় :

> আক্রমণের কারণ:  আরব মুসলমানদের সিন্ধু অঞ্চলে অভিযানের কারণ সম্পর্কে নানা মত আছে। কারো মতে, ইসলামধর্ম বিস্তারের উদ্দেশ্য, কেউ মনে করেন ধনসম্পদ লুণ্ঠন, আবার অনেকে মনে করেন ভারতের বাইরে সামরিক সাফল্য, আরব মুসলমানদের সিন্ধু অভিযানে উৎসাহিত করেছিল।

অনেকে বলেন, সিংহলের রাজা স্বয়ং ইসলামধর্ম গ্রহণ করে খলিফার উদ্দেশ্যে কিছু উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সিন্ধু উপকূলে সেই উপঢৌকন-ভরতি জাহাজ লুষ্ঠিত হয়। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে আরবের শাসনকর্তা হজ্জাজ সিন্ধু না করেছিলেন।


অনেকের মতে, ভারতে ক্রীতদাসী ও অন্যান্য  সামগ্রী ক্রয় করার জন্য খলিফা তার কয়েকজন অনুচরকে ভারতে পাঠান। কিন্তু সিন্ধুর নিকট সমুদ্রপথে আরবের জাহাজটি লুষ্ঠিত হয়। হজ্জাজ সিন্ধু দেশের রাজা দাহিরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। কিন্তু দাহির তা দিতে অস্বীকার করলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরিত হয়।

তবে খুব সম্ভবত এই অভিযানের কারণ ছিল এই রকম—সিংহলে মৃত আরব বণিকদের সম্পদ ও তাঁদের কন্যাদের আরবে ফেরত পাঠানোর সময় সিন্ধুর উপকূলে জলদস্যুরা তাদের অপহরণ করে। এতে আরব মুসলমানরা ক্ষুদ্ধ হয়ে সিন্ধু আক্রমণ করেছিল বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা।

ঘটনা যাই হোক হজ্জাজের সেনাপতি মহম্মদ-বিন্-কাশিমের নেতৃত্বে আরব মুসলমানরা ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিন্দু আক্রমণ করে। সিন্ধুর রাজা দাহির যুদ্ধে পরাজিত হন। সিন্ধু আরব মুসলমানদের দখলে আসে। 


6. কুতুবউদ্দিন আইবকের নাম স্মরণীয় কেন?

কুতুবউদ্দিন আইবক : 

মহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর (১২০৬ খ্রি.) পর ভারতে তাঁর প্রতিনিধি ও প্রশাসক কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানির সূচনা করেন।

>> দাস বংশের প্রতিষ্ঠা:  কুতুবউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত বংশ সাধারণভাবে দাসবংশ নামে পরিচিত। সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে কুতুবউদ্দিন নিজ শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ইলতুৎমিসের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ দেন, সিন্ধুদেশের শাসক নাসিরউদ্দিন কুবাচার সঙ্গে ভগ্নীর বিবাহ দেন। তিনি নিজে গজনীর শাসক তাজউদ্দিনের কন্যাকে বিবাহ করেন। এইভাবে বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারা তিনি বিদেশ-নীতির এক নতুন পথ তৈরি করেন।

কৃতিত্ব :

(i) কুতুবউদ্দিন ১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি গজনীর সঙ্গে ভারতের সুলতানি শাসনের সম্পর্ক ছিন্ন করে এদেশে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

 (II) কুতুবউদ্দিন একজন সুদক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। গুজরাটের রাজা ভীমদেব তাঁর হাতে পরাস্ত হন। 

(iii) দানশীলতার জন্য কুতুবউদ্দিন লাখবক্স নামে পরিচিত ছিলেন।

(iv) বাগদাদের প্রখ্যাত ধর্মগুরু খাজা কুতুবউদ্দিনের স্মৃতিরক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি দিল্লিতে কুতুবমিনার নির্মাণ শুরু করেন। তবে তিনি এটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। এ ছাড়া তিনি দিল্লি ও আজমীরে দুটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

১২১০ খ্রিস্টাব্দে চৌগান খেলার সময় কুতুবউদ্দিন দুর্ঘটনায় মারা যান। ঐতিহাসিক হাবিবউল্লাহ ন মতে, কুতুবউদ্দিনের মধ্যে তুর্কিজাতির সাহসিকতা ও পারসিকদের উদারতা এবং রুচিবোধের সমন্বয় ঘটেছিল।


7. সুলতানা রাজিয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

সুলতানা রাজিয়া : 

সুলতান ইলতুৎমিস মৃত্যুর পূর্বে নিজ কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। কিন্তু সুলতানের মনোনয়ন অগ্রাহ্য করে অভিজাতরা ইলতুৎমিসের পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসিয়ে দেন। রুকনউদ্দিন ফিরোজের অযোগ্যতার জন্য চারদিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে রাজিয়া অযোগ্য রুকনউদ্দিন ফিরোজকে হত্যা করে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন।

>> কৃতিত্বঃ  রাজিয়া তাঁর সাড়ে তিন বছরের রাজত্বে প্রশাসক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন।

(1) সিংহাসনে বসেই তিনি চারিদিকের বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

(2) ব্যক্তিগতভাবে রাজকার্য পরিচালনা করা, নিয়মিত দরবারে উপস্থিত থেকে অভাব অভিযোগের নিষ্পত্তি করা, ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা ইত্যাদি সমস্ত কাজেই তিনি পুরুষের সমান দক্ষতা দেখান। তিনি নিজ মুদ্রায় সুলতান শব্দ ব্যবহার করতেন।


(3) তিনি চল্লিশ চক্র বা বন্দেগান-ই-চাহেলগান নামে পরিচিত অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ভোগকারী তুর্কি অভিজ্ঞাতদের ক্ষমতা খর্ব করতে উদ্যোগী হন।

রাজিয়ার পুরুষসুলভ আচরণ এবং ইয়াকৎ নামে এক হাবসী অনুচরের প্রতি অতিরিক অনুগ্রহ প্রদর্শন তুর্কি আমীরনের ঊর্যা ও বিরক্তির কারণ হয়। এ ছাড়া তারা নারীর শাসন অপমানজনক মনে করে। তাই তৎকালের মধ্যে অভিজাতরা রাজিয়ার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হন এবং তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন। রাজিয়া বিদ্রোহী আমীরদের এক নেতা আলকুনিয়াকে বিবাহ করে অভিজাতদের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে উভয়েই বিদ্রোহীদের হাতে পরাজিত ও নিহত হন।


8. বলবনের রাজতান্ত্রিক আদর্শ কীরূপ ছিল ?

বলবনের রাজতান্ত্রিক আদর্শ :

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন একজন দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য আত্মনিয়োগ করেন।

(1) বলবন নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে অভিহিত করেন।

(2) জনসাধারণের মনে ভীতি উৎপাদনের জন্য তিনি উজ্জ্বল পোশাকে সজ্জিত বিশালদেহী সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে রাজোচিত গাম্ভীর্য সহকারে দরবারে আসতেন।

(3.) তিনি দরবারে হাস্যপরিহাস, আমোদপ্রমোদ, মদ্যপান নিষিদ্ধ করেন।

 (4) নিজেকে তিনি পারসিক বীর আফ্রাসিয়ারের বংশধর বলে দাবি করেন।

(5) পারস্যের অনুকরণে পাইবস অর্থাৎ সম্রাটের পদচুম্বন করা; সিজদা অর্থাৎ সিংহাসনের সামনে নতজানু হওয়া ইত্যাদি প্রথা চালু করেন।

(6) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। অপরাধ করলে অভিজাত বা আত্মীয়কেও তিনি ক্ষমা করতেন না। জনৈক অভিজাত ব্যক্তি তার ক্রীতদাসের ওপর অত্যাচার করেছিল। বলে বলবন সেই ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে  বেত্রাঘাত করেছিলেন।


9. আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য নীতি আলোচনা করো।

দাক্ষিণাত্য নীতি: 

উত্তর ভারত বিজয়ের পর আলাউদ্দিন দক্ষিণ ভারত বিজয়ে উদ্যোগী হন। আলাউদ্দিনের দাক্ষিণাত্রা অভিযানের পিছনে মূলত নিম্নলিখিত কারণগুলি কাজ করেছিল।

(1) আলাউদ্দিন ছিলেন ঘোর সাম্রাজ্যবাদী শাসক। তিনি আলেকজান্ডারের মতো দিগ্‌বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন এবং এক বিশাল সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। সেই বিশাল সৈন্যবাহিনী আলাউদ্দিনকে দাক্ষিণাত্য অভিযানে প্রলুদ্ধ করে।

(2) সেই সময় দক্ষিণ ভারতে চারটি সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। যথা—দেবগিরির যানব রাজা, তেলেঙ্গানার কাকতীয় রাজ্য, হোয়সল রাজ্য ও পাণ্ডা রাজ্য। এই রাজ্যগুলি পরস্পর বিবাদে লিপ্ত ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলির মধ্যে এই অনৈক্য আলাউদ্দিনকে দাক্ষিণাত্য অভিযানে উৎসাহিত করেছিল।


(3) দক্ষিণ ভারতের অফুরন্ত ঐশ্বর্য আলাউদ্দিনকে আকৃষ্ট করেছিল।

(4) জালালউদ্দিনের রাজত্বকালে দেবগিরি দিল্লিকে বাৎসরিক কর দিত। এই কর দিলে তা আদায় করার জন্য আলাউদ্দিন দাক্ষিণাতা অভিযান করেন।

অভিযান:  আলাউদ্দিনের দাক্ষিণাতা অভিযানে নেতৃত্ব দেন তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মালিক কাকুর। দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো বার্ষিক কর দেওয়া বন্ধ করলে আলাউদ্দিন ১৩০৬ খ্রিস্টাব্দে মালিক কাফুরকে দেবগিরির বিরুদ্ধে পাঠান। দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র আলাউদ্দিনের বশ্যতা স্বীকার করেন। ১৩০৮ খ্রিস্টাব্দে মালিক কাফুর বরলালের কাকতীয় বংশীয় রাজা দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্রকে আত্মসমর্পণে ধ্যে করেন। ১০১০ খ্রিস্টাব্দে মালিক কাফুর হোয়সল রাজ্য অতর্কিতে আক্রমণ করে হোয়সলরাজ তৃতীয় ইরবালকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে কাফুর পাণ্ডা রাজ্য আক্রমণ করেন এবং সহজেই করেন। তিনি সেতুবন্ধ রামেশ্বরম পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে দিল্লিতে ফিরে আসেন। (১০১৩ খ্রিস্টাব্দে কাকুরকে পুনরায় দেবগিরির বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। রামচন্দ্রের পুত্র শঙ্কর পিতৃ-প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী করদান বন্ধ করে দিলে কাফুর শঙ্করকে পরাজিত ও নিহত করেন। দেবগিরিতে দিল্লির প্রভুত্ব সমাপন করে কাফুর হোয়সল রাজ্য দিল্লির সাম্রাজ্যভুত্ব করেন।


এইভাবে ক্রমাগত অভিযান চালিয়ে আলাউদ্দিন সমগ্র দক্ষিণ ভারতে নিজ প্রভুত্ব স্থাপন করেন।


10. আকবরের রাজপুত নীতি কী ছিল ?

আকবরের রাজপুত নীতি :

আকবরের রাজপুত নীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাজপুতদের আনুগত্য লাভ করে মোগল শাসনকে ভারতীয় চরিত্র দেওয়া।

আকবর রাজপুতদের আনুগত্য লাভের জন্য নিম্নলিখিত নীতি গ্রহণ করেন।


বৈবাহিক সম্পর্ক দ্বারা বশ্যতা আদায়: আকবর নিজে অম্বররাজ বিহারীমলের কন্যা যোধাবাঈকে বিয়ে করেন এবং নিজপুত্র সেলিমের সঙ্গে ভগবানদাসের কন্যার বিবাহ দিয়ে রাজপুতদের আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করেন। বিহারীমল, ভগবানদাস, মানসিংহ প্রমুখ রাজপুতদের উচ্চপদ দান করে তিনি রাজপুতদের আনুগত্য লাভ করেন।

অম্বরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে মারওয়াড়, বিকানীর, বুন্দি,রণথস্তোর, কালিপ্তর প্রভৃতি রাজপুত রাজ্য আকবরের বশ্যতা মেনে নেয়।

 2. শক্তি প্রয়োগ:  শিশোদীয় বংশের রানা উদয়সিংহ মেবারের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন। আকবর ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রাজধানী চিতোর অবরোধ করেন। রানা উদয়সিংহ জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

উদয়সিংহের পর তাঁর পুত্র রানা প্রতাপ মেবারের স্বাধীনতা রক্ষায় সচেষ্ট হন। আসফ খাঁ ও মানসিংহের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী হলদিঘাটের যুদ্ধে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রানা প্রতাপকে পরাজিত করে। অতঃপর রানা প্রতাপ জঙ্গলে আত্মগোপন করে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াই চালিয়ে যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কয়েকটি দুর্গ দখল করতেও সক্ষম হন।


> ফলাফল: আকবরের রাজপুতনীতির ফলে রাজপুত শৌর্য, শাসনপ্রতিভা ও কূটনৈতিক দক্ষতা তাঁর রাজ্যরক্ষায় নিয়োজিত হয়। সর্বোপরি আকবরের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জাতীয় নীতি রাজপুত নীতির মাধ্যমে সূচিত হয়।


11. শিবাজীর অভিষেক সম্পর্কে টীকা লেখ।

শিবাজীর অভিষেক :

শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা জাতির উত্থান ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। শিবাজী দক্ষিণ ভারতে মারাঠা রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে নিজের অভিষেক সম্পন্ন করেন। 

(1) আগ্রা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর শিবাজী শাসনব্যবস্থা সংগঠিত করার কাজে মন দেন। ঔরঙ্গজেবও এই সময় উত্তর-পশ্চিম ভারতের উপজাতি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই তিনি শিবাজীকে রাজা উপাধি দান করেন (১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ)। শম্ভুজীকে পাঁচ হাজারী মনসবদার পদে নিযুক্ত করেন। তবে পুরন্দরের সন্ধিতে পাওয়া দুর্গগুলি তিনি শিবাজীকে ফিরিয়ে দেননি। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে শিবাজী পুনরায় মোগলদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তিনি একে একে পুরন্দর, কল্যান, সিংহগড় দুর্গগুলি উদ্ধার করেন। জিঙি, ভেলোর, কর্ণাটকের কিছু অংশ তিনি অধিকার করেন। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে শিবাজী দ্বিতীয়বার সুরাট বন্দর লুণ্ঠন করেন। কিন্তু তখনও তিনি স্বাধীন রাজা হিসেবে স্বীকৃত হননি। তত্ত্বগত দিক থেকে তাঁর পরিচয় ছিল, তিনি মোগলদের অধীন একজন প্রজা ও জায়গীরদার মাত্র। এ ছাড়া তাঁর উত্থানে মারাঠাদের অন্যান্য গোষ্ঠী ঈর্ষান্বিত হয়। তাই তারা শিবাজীকে রাজা বলে স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না। অথচ নিজেকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ‘রাজা' উপাধির প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর সভাসদরা ভেবেছিলেন। এই কারণে রাজ্যাভিষেকের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। 

(2) ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে রায়গড় দুর্গে তিনি নিজের অভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন করেন।  শিবাজী ছত্রপতি ও গো-ব্রাহ্মণ-প্রজাপালক উপাধি গ্রহণ করেন।


12. মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা রূপে বাবরের কৃতিত্ব বর্ণনা করো।

মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা রূপে বাবরের কৃতিত্ব

ভারতে মুসলমান শাসনের দ্বিতীয় পর্বের বা মোগল সাম্রাজ্যের সূচনা করেন জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর। শুরু হয় ভারত-ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।


 1. পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাড: দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদির সঙ্গে পাঞ্জাবের শাসন কর্তা দৌলত খাঁ-র বিরোধ দেখা দিলে দৌলত খাঁ ইব্রাহিমকে জব্দ করার জন্য বাবরকে ভারত-আক্রমণের প্ররোচনা দেন। বাবর কালবিলম্ব না করে কি বাহিনীসহ ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদি বাবরকে বাধা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। পানিপথের প্রান্তরে উভয় পক্ষে যুদ্ধ হয় (১৫২৬ খ্রি.)। এটি 'পানিপথের প্রথম যুদ্ধ' নামে পরিচিত। যুদ্ধে ইব্রাহিমকে হত্যা করে বাবর দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।


2.খানুয়ার যুদ্ধে জয়লাড: পরের বছরেই বাবর মেবারের রানা সংগ্রামসিংহের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন। ১৫২৭-এর ১৬ মার্চ খানুয়ার প্রান্তরে উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়। রাজপুতগণ অসম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেও পিছু হটতে বাধ্য হয়। রানা সঙ্গ কোনোক্রমে পালিয়ে গিয়ে প্রাণরক্ষা করেন।


3. ঘর্ঘরার যুদ্ধে জয়লাভ: রাজপুতদের শক্তি খর্ব করার পর বাবর আফগানদের প্রতি নজর দেন। তখন ইব্রাহিম লোদির ভাই মামুদ লোদি আফগান সর্দারদের সংঘবদ্ধ করে বাবরের বিরোধিতা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। পাটনার উত্তরে গঙ্গা ও ঘর্ঘরা নদীর সংগমস্থলে মোগল ও আফগান বাহিনীর সংঘর্ষ হয় (১৫২৯ খ্রি.)। ঘর্ঘরা যুদ্ধে আফগানরা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের একবছর পর ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে বাবর মৃত্যুবরণ করেন।


>> মূল্যায়ন: মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতারূপে বাবরের নাম ভারত-ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। (i) ভারতের প্রতিষ্ঠিত শক্তি আফগান ও রাজপুতদের পরাজিত করে তিনি সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। সুলতানি শাসনের ভাঙন ভারতের রাজনীতিতে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, বাবর তার অবসান ঘটান।


13. আকবরের উত্তর ভারত বিজয়ের বিবরণ দাও।

আকবরের উত্তর ভারত বিজয় :

দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে জয়ের চার বছরের মধ্যে বৈরাম খাঁ-র নেতৃত্বে আকবর গোয়ালিয় আজমীর, জৌনপুর দখল করে নেন। ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে বৈরাম খাঁ-র পতনের পর আকবর তাঁর রাজ্যবি নীতির সূচনা করেন।।


> মালব: ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে আদম খান ও পীর মহম্মদের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী মালয়ে সুলতান রাজবাহাদুরকে পরাস্ত করে মালব অধিকার করে। কিন্তু পীর মহম্মদের দুর্বলতার সুযোগে বাজবহর মালব পুনরুদ্ধার করেন। পুনরায় আকবরের সেনাপতি আবদুল্লা খান উজবেগ বাজবাহাদুরকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্ন করে মালব অধিকার করেন। মালবে আকবরের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।


গণ্ডোয়ানা: ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সেনাপতি আসফ খাঁ গড়কাতালা বা গন্ডোয়ান জয় করেন। রানি দুর্গাবতী অসম সাহসিকতার সঙ্গে মোগল বাহিনীকে বাধা দিয়েও পরাজয় বরণ করবে বাধ্য হন।


> অম্বর: আকবর রাজপুতদের প্রতি প্রথমে আত্মীয়তা ও মিত্রতা স্থাপনের নীতি নেন। অম্বরের রাজা বিহারীমল বিনাযুদ্ধে আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেন। আকবর বিহারীমলের প্রস্তাবে তাঁর কন্য মানবাঈকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। তিনি বিহারীমলকে পাঁচহাজারি মনসবদার নিযুক্ত করেন এবং তাঁর পূর ভগবানদাস এবং পৌত্র মানসিংহ ও উচ্চরাজপদ দান করেন।


> অন্যান্য রাজ্য: অম্বরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে মারওয়াড়, বিকানীর, বুন্দি, রণথস্তোর, কালিঞ্জর প্রভৃতি রাজপুত রাজ্যও আকবরের বশ্যতা মেনে নেয়।


মেবারের প্রতিরোধ: মেবার বিনা যুদ্ধে মোগলের বশ্যতা মেনে নিতে অস্বীকার করে। শিশোদীয়া বংশের রানা উদয়সিংহ মেবারের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন। আকবর ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে মেবার আক্রমণ করেন। যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে রানা উদয়সিংহ জঙ্গলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

উদয়সিংহের পর তাঁর পুত্র রানা প্রতাপ মেবারের স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা করেন। আসফ খাঁ ও মানসিংহের নেতৃত্বে মোগল বাহিনী। হলদিঘাটের যুদ্ধে রানা প্রতাপকে পরাজিত করে (১৫৭৬ খ্রি.)। অতঃপর প্রতাপ জালে আত্মগোপন করে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াই চালিয়ে যান।

এরপর আকবর গুজরাট, বাংলা, কাবুল, কান্দাহার, কাশ্মীর, বালুচিস্তান ও সিন্ধু জয় করেন। এই জয়ের ফলে সমস্ত উত্তর ভারতে মোগল অধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।